সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে দায়ের করা বহুল আলোচিত মানবতাবিরোধী অপরাধ মামলার রায় পড়া শুরু করেছে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল (ICT)। ইতিহাসের পাতায় স্থান করে নিতে যাওয়া এই মামলার রায়কে ঘিরে দেশজুড়ে তীব্র উত্তেজনা বিরাজ করছে।
সোমবার (১৭ নভেম্বর) সকালে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ এর তিন সদস্যের বিচারপতি প্যানেল এই গুরুত্বপূর্ণ রায় ঘোষণা শুরু করেন। প্যানেলের নেতৃত্বে রয়েছেন চেয়ারম্যান বিচারপতি গোলাম মর্তূজা মজুমদার। তাঁর সঙ্গে আছেন অন্য দুই সদস্য বিচারপতি মো. শফিউল আলম মাহমুদ এবং বিচারক মো. মোহিতুল হক এনাম চৌধুরী।
মূল এজলাসে রায় ঘোষণা শুরু: বিচারপতির প্যানেল
এর আগে গত ১৩ নভেম্বর বিচারিক প্যানেল এ মামলার রায় ঘোষণার জন্য আজকের দিনটি ধার্য করেন। মামলার কার্যক্রমের শুরু থেকেই এটিকে দেশের ইতিহাসে এক নজিরবিহীন ঘটনা হিসেবে চিহ্নিত করা হচ্ছে, যেখানে একজন সাবেক প্রধানমন্ত্রীর বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগ আনা হয়েছে।
এই মামলায় অভিযুক্তদের মধ্যে ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল পলাতক রয়েছেন। অন্যদিকে, মামলার অন্যতম অভিযুক্ত চৌধুরী আবদুল্লাহ আল-মামুনকে রাজসাক্ষী (State Witness) ঘোষণা করা হয়েছিল। সকালে কড়া নিরাপত্তার মধ্যে প্রিজনভ্যানে করে তাঁকে কারাগার থেকে ট্রাইব্যুনালের এজলাসে হাজির করা হয়।
নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তায় ট্রাইব্যুনাল এলাকা: পুলিশ, র্যাব, আর্মি মোতায়েন
শেখ হাসিনার এই মামলার রায় ঘোষণাকে কেন্দ্র করে সুপ্রিম কোর্ট চত্বর এবং আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল (ICT) এলাকায় নজিরবিহীন নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে পুলিশের পাশাপাশি র্যাব, আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়ন (APBn) ও বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (BGB) এর সদস্যরা কয়েক স্তরের নিরাপত্তা বেষ্টনী তৈরি করেছেন। এছাড়াও, স্পর্শকাতর এই মুহূর্তে গোয়েন্দা সংস্থার সদস্যদের তৎপরতাও চোখে পড়ার মতো।
বিশেষ করে, নিরাপত্তার স্বার্থে রোববার সন্ধ্যা থেকেই দোয়েল চত্বর হয়ে শিক্ষাভবনমুখী সড়কে যান চলাচল পুরোপুরি বন্ধ করে দেওয়া হয়। সাধারণ মানুষের চলাচলও কঠোরভাবে সীমিত করা হয়েছে। সর্বোচ্চ সতর্কতামূলক ব্যবস্থা হিসেবে সামরিক বাহিনীর সদস্যদেরও রিজার্ভ ফোর্স হিসেবে প্রস্তুত রাখা হয়েছে বলে জানা গেছে।
আদালতে 'স্টেট উইটনেস' মামুন: পলাতক হাসিনা-কামাল
মামলাটিতে মোট ২৮ কার্যদিবসে ৫৪ জন সাক্ষীর সাক্ষ্যগ্রহণ ও জেরা পর্ব সম্পন্ন হয়। এরপর প্রসিকিউশন পক্ষ ও রাষ্ট্রনিযুক্ত ডিফেন্স পক্ষের মধ্যে ৯ কার্যদিবসে চলে যুক্তিতর্ক ও পাল্টা যুক্তিখণ্ডন। ২৩ অক্টোবর রাষ্ট্রের প্রধান আইন কর্মকর্তা অ্যাটর্নি জেনারেল মো. আসাদুজ্জামানের সমাপনী বক্তব্য এবং চিফ প্রসিকিউটর মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম ও রাষ্ট্রনিযুক্ত আইনজীবী আমির হোসেনের যুক্তিখণ্ডন শেষে রায়ের দিন ধার্য করা হয়।
যুক্তিতর্কে প্রসিকিউশন পক্ষ শেখ হাসিনা এবং আসাদুজ্জামান খান কামালের জন্য সর্বোচ্চ সাজার আবেদন জানায়। তবে রাজসাক্ষী (State Witness) হওয়ায় চৌধুরী আবদুল্লাহ আল-মামুনের দণ্ডাদেশের বিষয়টি ট্রাইব্যুনালের সিদ্ধান্তের ওপর ছেড়ে দেওয়া হয়। যদিও তাঁর পক্ষে আইনজীবী যায়েদ বিন আমজাদ খালাস চেয়ে আদালতের কাছে আর্জি জানান।
কী ছিল প্রসিকিউশনের অভিযোগ ও প্রমাণাদি?
প্রসিকিউশনের পক্ষ থেকে এই মামলায় তিন আসামির বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের মোট পাঁচটি সুনির্দিষ্ট অভিযোগ আনা হয়। এর মধ্যে রয়েছে— উসকানি, মারণাস্ত্র ব্যবহার করে হত্যা, আবু সাঈদ হত্যা, চানখাঁরপুলে হত্যা এবং আশুলিয়ায় লাশ পোড়ানোর মতো গুরুতর অপরাধ।
মামলাটির আনুষ্ঠানিক অভিযোগ মোট ৮ হাজার ৭৪৭ পৃষ্ঠার বিশাল নথি। এর মধ্যে তথ্যসূত্র রয়েছে ২ হাজার ১৮ পৃষ্ঠার, জব্দতালিকা ও দালিলিক প্রমাণাদি ৪ হাজার ৫ পৃষ্ঠার এবং শহীদদের তালিকার বিবরণ ২ হাজার ৭২৪ পৃষ্ঠার। প্রসিকিউশন শুরুতে মোট ৮৪ জনকে সাক্ষী হিসেবে উপস্থাপনের পরিকল্পনা করেছিল। গত ১২ মে ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থা চিফ প্রসিকিউটরের কাছে এ মামলার প্রতিবেদন জমা দেয়।