জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় বাংলাদেশের ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল। এই ঐতিহাসিক রায়ের পর বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতির চেয়েও বড় হয়ে উঠেছে আন্তর্জাতিক অঙ্গনের প্রশ্ন— ভারতে অবস্থানরত শেখ হাসিনাকে কি হস্তান্তর করা হবে? তবে ভূ-রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, নয়াদিল্লি কোনো অবস্থাতেই শেখ হাসিনাকে বাংলাদেশের হাতে প্রত্যর্পণ করবে না, যা দুই দেশের ভঙ্গুর সম্পর্কে এক নতুন মাত্রা যোগ করতে চলেছে।
ঐতিহাসিক রায় ও আন্তর্জাতিক সমীকরণ সোমবার (১৭ নভেম্বর) আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ এর বিচারপতি গোলাম মর্তুজা মজুমদারের নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের বিচারিক প্যানেল ৪৫৩ পৃষ্ঠার রায়ের সারসংক্ষেপ পাঠ করে শোনান। মামলার দুটি মূল অভিযোগের মধ্যে দ্বিতীয়টিতে শেখ হাসিনাকে সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড এবং প্রথমটিতে আমৃত্যু কারাদণ্ড দেওয়া হয়। রায়ে আদালত দ্ব্যর্থহীনভাবে বলেন, "শেখ হাসিনা মানবতাবিরোধী অপরাধ করেছেন।" এই রায় ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গেই এর কার্যকারিতা এবং পরবর্তী পদক্ষেপ নিয়ে শুরু হয়েছে চুলচেরা বিশ্লেষণ, যার কেন্দ্রে রয়েছে ভারত।
'প্রত্যর্পণ করবে না ভারত': বিশেষজ্ঞের অভিমত ভারতের জিন্দাল গ্লোবাল ইউনিভার্সিটির দক্ষিণ এশীয় স্টাডিজের বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক শ্রীরাধা দত্ত আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরাকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে এই রায়ের বিষয়ে তার সুচিন্তিত মত ব্যক্ত করেন। তিনি বলেন, হাসিনার বিরুদ্ধে এই রায় অপ্রত্যাশিত ছিল না, কিন্তু ভারত তাকে হস্তান্তর করবে না। তাঁর কথায়, "কোনো অবস্থাতেই ভারত তাকে (শেখ হাসিনা) প্রত্যর্পণ করবে না। গত দেড় বছরে আমরা দেখেছি যে ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে সম্পর্ক ভালো অবস্থানে নেই এবং অনেক সময় তা ভঙ্গুরও হয়ে পড়েছে।"
অধ্যাপক দত্ত আরও মনে করেন, এই বিচারিক প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন তোলার সুযোগ কম। তিনি বলেন, "আন্তর্জাতিক মানবাধিকার পর্যবেক্ষকরা একমত যে বাংলাদেশে ট্রাইব্যুনালের কার্যক্রম দেশের আইনি ব্যবস্থা অনুসরণ করেই পরিচালিত হয়েছে। দেশটির পরিস্থিতি সবাই দেখেছে। সবার আশা ছিল, তার (শেখ হাসিনা) বেশ কঠোর বিচার হবে।"
যে অপরাধে এই রায় জিন্দাল গ্লোবাল ইউনিভার্সিটির এই অধ্যাপক জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের প্রেক্ষাপট তুলে ধরে বলেন, "নিরস্ত্র ছাত্রদের বিরুদ্ধে সংঘটিত অপরাধ সম্পর্কে কারও সন্দেহ নেই। তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী যে সরাসরি গুলি করার নির্দেশ দিয়েছিলেন, তার প্রমাণ আছে।" তিনি মনে করেন, আওয়ামী লীগ এই রায়কে ঘিরে একটি পাল্টা আখ্যান বা ‘counter-narrative’ তৈরির চেষ্টা করলেও বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের বিশ্বাস যে, হাসিনা মানবতাবিরোধী অপরাধে দায়ী।
একই মামলায় তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল এবং চৌধুরী মামুনের বিরুদ্ধেও মানবতাবিরোধী অপরাধের প্রমাণ মিলেছে বলে আদালত জানান। তবে চৌধুরী আব্দুল্লাহ আল মামুন রাজসাক্ষী হয়ে সত্য উন্মোচনে সহায়তা করায়, তার সর্বোচ্চ দণ্ড মকুব হতে পারে বলে ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে।
এই রায় এবং শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ ঘিরে ভারতের সম্ভাব্য ‘না-সূচক’ অবস্থান কেবল দুই দেশের কূটনৈতিক সম্পর্ককেই নয়, বরং সমগ্র দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনৈতিক স্থিতিশীলতাকেও এক বড় পরীক্ষার মুখে ফেলল। নয়াদিল্লির পরবর্তী পদক্ষেপই এখন এই অঞ্চলের রাজনীতির ভবিষ্যৎ গতিপথ নির্ধারণ করে দেবে।