প্রেম কোনো সীমানা, ভাষা বা সংস্কৃতি মানে না—এই প্রবাদটিকেই যেন বাস্তবে রূপ দিলেন চীনের যুবক লু চাঁওং (৩৫) এবং ভোলার তরুণী ফেরদৌস বেগম (১৯)। ‘ওয়ার্ল্ডটক’ নামক একটি মোবাইল অ্যাপ্লিকেশনে পরিচয়ের পর দীর্ঘ এক বছরের প্রেমকে পরিণতি দিতে সুদূর চীন থেকে বাংলাদেশের ভোলায় ছুটে এসেছেন লু চাঁওং। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে ভোলা সদর উপজেলার শিবপুর ইউনিয়নে এখন উৎসবমুখর পরিবেশ, ভিনদেশি প্রেমিককে এক নজর দেখতে এলাকাবাসীর উপচে পড়া ভিড়।
সোমবার সকালে শিবপুর ইউনিয়নের ৩ নম্বর ওয়ার্ডের স্লুইচগেট এলাকায় ফেরদৌসের বাড়িতে এসে পৌঁছান লু চাঁওং। ভাষাগত ভিন্নতা আর সাংস্কৃতিক দূরত্ব সত্ত্বেও তাদের এই প্রেমের গল্প এখন এলাকার মানুষের মুখে মুখে ফিরছে।
অ্যাপে পরিচয়, যেভাবে গল্পের শুরু গল্পের শুরুটা হয়েছিল প্রায় এক বছর আগে। ফেরদৌস বেগম জানান, কৌতূহলের বশেই তিনি ফোনে ‘ওয়ার্ল্ডটক’ অ্যাপটি ডাউনলোড করেন। কিন্তু কিছু অপ্রীতিকর মেসেজের কারণে অ্যাপটি মুছে ফেলার সিদ্ধান্ত নেন। ঠিক তখনই তার কাছে মেসেজ আসে লু চাঁওংয়ের। প্রথমে গুরুত্ব না দিলেও চীনা যুবকের ক্রমাগত আন্তরিক বার্তায় সাড়া দেন ফেরদৌস। মেসেজ আদান-প্রদানের মাধ্যমে লু চাঁওংয়ের সুন্দর মানসিকতার পরিচয় পেয়ে তার প্রতি আকৃষ্ট হন তিনি।
ফেরদৌস বলেন, "এক পর্যায়ে লু চাঁওং আমাকে বিয়ের প্রস্তাব দেয়। আমি প্রথমে রাজি হইনি, কারণ আমার পরিবার এত দূরে বিয়েতে সম্মতি দেবে না বলে মনে হয়েছিল। কিন্তু সে আমাকে অভয় দিয়ে বলে, ‘তুমি ভয় পেয়ো না, আমি তোমাকে সব রকম নিরাপত্তা দেবো। চায়না খুব ভালো দেশ, এখানে মেয়েদের অনেক গুরুত্ব ও অধিকার দেওয়া হয়’।" এই আশ্বাসের পরেই তাদের মধ্যে প্রেমের সম্পর্ক গভীর হতে থাকে এবং লু চাঁওং বাংলাদেশে আসার সিদ্ধান্ত নেন।
গত ১৫ নভেম্বর ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পৌঁছালে ফেরদৌস ও তার মা মরিয়ম বেগম তাকে স্বাগত জানিয়ে ভোলায় নিয়ে আসেন।
ভাষা-ধর্মের বাধা পেরিয়ে পরিণতির পথে এই সম্পর্কের প্রধান বাধা ছিল ভাষা। ফেরদৌস চীনা ভাষা জানেন না, আর লু চাঁওং বোঝেন না বাংলা। তবে আধুনিক প্রযুক্তি তাদের এই সমস্যার সমাধান করে দিয়েছে। মোবাইলের ‘Google Translate’ ব্যবহার করেই চলছে তাদের মন দেওয়া-নেওয়া। ছোটখাটো ভুল বোঝাবুঝি হলেও প্রযুক্তির সাহায্যে তারা একে অপরের অনুভূতি ঠিকই বুঝে নিচ্ছেন।
অন্যদিকে, ধর্মীয় ভিন্নতাও একটি বিষয়। লু চাঁওং মুসলিম না হওয়ায় ফেরদৌসের পরিবার এখনই বিয়ের আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করতে নারাজ। ফেরদৌসের মা মরিয়ম বেগম জানান, "প্রথমে মেয়ের কাছে সব শুনে আমরা ছেলে ও তার বাবা-মায়ের সঙ্গে কথা বলেছি। তারা আমাদের সব রকম আশ্বাস দিয়েছেন। ছেলে আমাদের বাড়িতে এসেছে, আমরা খুশি। তবে আইনি ও ধর্মীয় প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার জন্য আইনজীবীদের সঙ্গে কথা বলছি। সব প্রক্রিয়া শেষ হলেই আনুষ্ঠানিকভাবে তাদের বিয়ে দেওয়া হবে।"
আগেও দেখেছে ভোলা ভোলায় প্রেমের টানে বিদেশি যুবকের ছুটে আসার ঘটনা এটিই প্রথম নয়। এই ঘটনা সবাইকে মনে করিয়ে দিচ্ছে গত মে মাসের আরেকটি ঘটনার কথা। সে সময় জেলার ভেলুমিয়া ইউনিয়নের নাবিয়া আক্তারকে বিয়ে করতে চীন থেকে এসেছিলেন ইরিছা চং নামের আরেক যুবক। ১০ লাখ টাকা কাবিনে বিয়ের পর নাবিয়াকে চীনে নিয়ে যান তিনি। পরপর এমন ঘটনায় অনেকেই মনে করছেন, ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে সীমানা ছাড়িয়ে সম্পর্ক তৈরিতে ভোলার তরুণ-তরুণীরা এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করছেন।
ভোলা সদর মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আবু সাহাদাৎ মো. হাচানাইন পারভেজ জানিয়েছেন, "চীনা যুবকের আগমনের বিষয়টি আমাদের জানা আছে। তিনি বৈধ পাসপোর্ট ও ভিসা নিয়েই বাংলাদেশে এসেছেন। তারপরেও সার্বিক নিরাপত্তার স্বার্থে আমরা তাকে পর্যবেক্ষণে রেখেছি।"