সিরাজগঞ্জের রায়গঞ্জ উপজেলায় নিখোঁজ গরু ব্যবসায়ী আব্দুল লতিফ হত্যারহস্যের কিনারা হলো। এক নারীসহ মোট ৪ জনকে গ্রেপ্তারের পর চাঞ্চল্যকর এই হত্যাকাণ্ডের মূল কারণ ও নৃশংস পরিকল্পনার চিত্র সামনে এনেছে জেলা ডিবি পুলিশ। গ্রেপ্তারকৃতরা মঙ্গলবার (১৮ নভেম্বর, ২০২৫) স্থানীয় আদালতে নিজেদের দোষ স্বীকার করে ১৬৪ ধারায় গুরুত্বপূর্ণ জবানবন্দি প্রদান করেছেন, যেখানে তারা বিস্তারিতভাবে খুনের সম্পূর্ণ বিবরণ দিয়েছেন।
নিহত গরু ব্যবসায়ী আব্দুল লতিফ (৪০) সলঙ্গা থানার চর ফরিদপুর গ্রামের বাসিন্দা ছিলেন। গত ৯ নভেম্বর তিনি নিখোঁজ হন এবং এর তিন দিন পর ১২ নভেম্বর সকালে বাড়ির পাশের ফুলজোড় নদী থেকে তার মরদেহ উদ্ধার করা হয়। মরদেহের শরীরে ইট বাঁধা ছিল, যা প্রাথমিকভাবেই একে একটি সুপরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড বলে ইঙ্গিত দিচ্ছিল।
গ্রেপ্তার ও জবানবন্দি: ক্লুলেস মামলার সফল তদন্ত
মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ও ডিবি পুলিশের সাব-ইন্সপেক্টর (এসআই) নাজমুল হক নিশ্চিত করেন, তথ্য প্রযুক্তি (Information Technology) এবং ডিজিটাল ফরেনসিকস (Digital Forensics) ব্যবহারের মাধ্যমে এই ক্লুলেস মামলাটির আসামিদের দ্রুত শনাক্ত করা সম্ভব হয়।
সোমবার সন্ধ্যায় অল্প সময়ের ব্যবধানে মূল পরিকল্পনাকারী প্রবাসীর স্ত্রী শাহিনুর খাতুন (৪০), নিহতের বোনজামাই রফিকুল ইসলাম (৪০), এবং ঘাতক মাসুদ রানা (৪০) ও ফরিদুল ইসলামকে (৪২) গ্রেপ্তার করা হয়। পরদিন মঙ্গলবার গ্রেপ্তারকৃত ৪ জনই সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট কে এম শাহরিয়ার শহিদ বাপ্পীর আদালতে নিজেদের দোষ স্বীকার করে জবানবন্দি দেন। সন্ধ্যাতেই তাদের কারাগারে পাঠানো হয়।
নেপথ্যের কাহিনি: পরকীয়া, দেনা ও চক্রান্তের জাল
তদন্তে ডিবি পুলিশ জানতে পারে, নিহত আব্দুল লতিফের সঙ্গে প্রতিবেশী প্রবাসীর স্ত্রী শাহিনুর খাতুনের প্রায় দুই বছর যাবৎ পরকীয়া সম্পর্ক (Extra-marital Affair) চলছিল। সম্পর্ক চলাকালীন লতিফ শাহিনুরের কাছ থেকে ২ লাখ টাকা হাওলাত (Loan) নিয়েছিলেন। পাওনা টাকা নিয়ে লতিফের ওপর শাহিনুরের ক্রমাগত তাগাদা দেওয়ায় কিছুদিন আগে তাদের সম্পর্কের অবনতি ঘটে।
এই তিক্ততার সুযোগে এবং লতিফকে সরিয়ে দেওয়ার মানসে শাহিনুর লতিফের বোনজামাই রফিকুল ইসলামের সঙ্গে একটি অনৈতিক সম্পর্কে (Immoral Relationship) জড়িয়ে পড়েন। এরপর তারা দুজন মিলে আব্দুল লতিফকে পৃথিবী থেকে সরিয়ে দেওয়ার এক ভয়ংকর পরিকল্পনা করেন।
হত্যাকাণ্ড ও নির্মম স্বীকারোক্তি
আদালতে দেওয়া জবানবন্দি অনুযায়ী, শাহিনুর ও রফিকুল মিলে লতিফকে হত্যা করার জন্য ২ লাখ টাকার বিনিময়ে ৫ জন পেশাদার ঘাতককে (Hired Killers) ভাড়া করেন।
ঘটনার রাতে মূল পরিকল্পনাকারী শাহিনুর কৌশলে মোবাইল করে লতিফকে ফুলজোড় নদীর তীরে ডেকে নিয়ে যান। লতিফ সেখানে পৌঁছালে ভাড়া করা ঘাতকরা তাকে ঘিরে ফেলে। এরপর গলায় কাপড় পেঁচিয়ে শ্বাসরোধ করে নির্মমভাবে তাকে হত্যা করা হয়। নৃশংসতা এখানেই শেষ হয়নি, প্রমাণ লোপাটের উদ্দেশ্যে তারা মরদেহের সঙ্গে ভারী ইট বেঁধে ফুলজোড় নদীর গভীর জলে ফেলে দেয়।
এসআই নাজমুল হক জানান, এই হত্যাযজ্ঞে মোট ৭ জন অংশ নিয়েছিল। গ্রেপ্তার ৪ জন ছাড়া বাকি ৩ পলাতক আসামিকে দ্রুত গ্রেপ্তারের জন্য Law Enforcement Agency-এর অভিযান অব্যাহত রয়েছে।