চট্টগ্রামের বাঁশখালী উপজেলায় গত ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে উন্নয়নমূলক কাজে ব্যাপক অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে। বড় প্রকল্পের পাশাপাশি একটি ছোট কিন্তু অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সংযোগ সড়ক নির্মাণেও বিস্তর লুটপাটের অভিযোগ উঠেছে, যার ফলস্বরূপ চরম দুর্ভোগ পোহাচ্ছেন স্থানীয় জনসাধারণ।
২০২৩ সালে বাঁশখালীর দুটি ওয়ার্ডের সংযোগ সড়ক নির্মাণে ৩ কোটি ৩৭ লাখ ৭৫ হাজার ২৮৫ টাকার একটি প্রকল্পে নিম্নমানের ইট, বালু, পাথর, কংক্রিট ও সিমেন্ট ব্যবহারের অভিযোগ উঠেছে। কাজ শেষ হওয়ার মাত্র এক বছরের মধ্যেই সড়কের বেশিরভাগ অংশের ঢালাই উঠে গিয়ে ফেটে গেছে এবং বড় বড় গর্তের সৃষ্টি হয়েছে। ভুক্তভোগীরা গত ছয় মাসে সরকারের সংশ্লিষ্ট অন্তত ছয়টি দপ্তরে লিখিত অভিযোগ জমা দিলেও এখন পর্যন্ত দৃশ্যমান কোনো ব্যবস্থা নেয়নি প্রশাসন।
কাজে অনিয়ম: অভিযোগ ও আত্মসাতের দাবি
বাঁশখালী উপজেলার ৭ নম্বর সরল ইউনিয়নের ৮ ও ৯ নম্বর ওয়ার্ডের পাইরাং টু সরল ইউপি বাই জালিয়াঘাটা সংযোগ সড়কের এই বেহাল দশা নিয়ে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান তাহিরা এন্টারপ্রাইজের বিরুদ্ধে কাজ না করেই অধিকাংশ অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ উঠেছে।
সরেজমিন দেখা গেছে, সড়কটির বিভিন্ন অংশে ফাটল ও গর্ত সৃষ্টি হয়েছে। নতুন নির্মিত এই সড়কের এই দুর্দশা নিয়ে স্থানীয় বাসিন্দা মো. মাসুম হোসাইন গত ছয় মাসে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) এবং চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক (ডিসি), চট্টগ্রাম এলজিইডি’র নির্বাহী প্রকৌশলীসহ সরকারের স্থানীয় সব দপ্তরে অন্তত ছয়টি লিখিত অভিযোগ জমা দিয়েছেন। তিনি অভিযোগ করেন, মূলত সিসি ঢালাই (CC Pavement) দেওয়ার জন্য টেন্ডার হলেও ঠিকাদার তা না করে নিম্নমানের সামগ্রী ব্যবহার করেছেন।
মাসুম হোসাইন কালবেলাকে আরও বলেন, "সম্প্রতি তারা রাস্তায় কালো রং মেশাতে এসেছিল যাতে জনগণ নিম্নমানের কাজটি বুঝতে না পারেন। বিষয়টি বোঝার সঙ্গে সঙ্গেই স্থানীয় ক্ষুব্ধ জনতা তাদের ধরে ফেলেন এবং ঠিকাদারের লোকজন কাজ ফেলে এলাকা ছেড়ে পালিয়ে যায়।"
ঠিকাদার ও প্রশাসনের ভিন্নমত
এসব অভিযোগের বিষয়ে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান তাহিরা এন্টারপ্রাইজের মালিক মোহাম্মদ ইসমাইল সবকিছু অস্বীকার করেছেন। তাঁর দাবি, নির্মাণ কাজের সময় বন্যা হওয়ায় পানির তোড়েই রাস্তার এই দুর্দশা হয়েছে। তিনি নিজেই স্বীকার করেছেন যে, অভিযোগকারীর সঙ্গে সমঝোতার চেষ্টা করছেন যাতে তাঁর লাইসেন্স বেঁচে যায় ও কাজের অডিট এড়ানো যায়।
অন্যদিকে, উপজেলা প্রশাসনের বক্তব্য ঠিকাদারের ভাষ্যের সঙ্গে মিলছে না।
উপজেলা প্রকৌশলী কাজী ফাহাদ বিন মাহমুদ বলেন, সড়ক নির্মাণের সময় ব্যবহৃত সকল উপকরণ প্লান্টে পরীক্ষা করা হয়েছিল এবং সব রিপোর্ট হালনাগাদ আছে। তাঁর দাবি, নিয়ম অনুযায়ী সড়কটি ২৮ দিন বন্ধ থাকার কথা থাকলেও দু-তিন দিনের মাথাতেই এলাকার লোকজন গাড়ি চালানো শুরু করেন। নির্ধারিত সময়ের আগে লোড আসায় উপরের সারফেসের কিছু নুড়ি পাথর উঠে গেছে। তিনি ঠিকাদারকে দিয়ে পাতলা কার্পেটিংয়ের মতো প্রলেপ দেওয়ার চেষ্টা করেছেন, কিন্তু স্থানীয়রা তাতে বাধা দেন।
বাঁশখালীর ইউএনও মোহাম্মদ জামশেদুল আলম বিষয়টি এলজিইডি’র এখতিয়ারভুক্ত বলে উল্লেখ করে জানান, এ বিষয়ে উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে সাহসী কিছু করার সুযোগ নেই।
ইউনিয়ন পরিষদের প্যানেল চেয়ারম্যান রোকসানা আকতারও ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে রাস্তার ইট, বালু উঠে যাওয়া, গর্ত হওয়া এবং ফাটল ধরার সত্যতা নিশ্চিত করেছেন। তিনি বলেন, “কাজটি করার সময় আমরা দেখিনি। ফলে এতে ঠিকাদার অথবা এলজিইডির ইঞ্জিনিয়ারসহ কাদের গাফিলতি ছিল, তা আমরা বলতে পারব না।”