• দেশজুড়ে
  • ঘুষের বিনিময়ে এমপিও, জালিয়াতির পাহাড়: তদন্তে অপরাধ ‘প্রমাণিত’ হলেও বহাল তবিয়তে মাউশির ৫ কর্মকর্তা

ঘুষের বিনিময়ে এমপিও, জালিয়াতির পাহাড়: তদন্তে অপরাধ ‘প্রমাণিত’ হলেও বহাল তবিয়তে মাউশির ৫ কর্মকর্তা

দেশজুড়ে ১ মিনিট পড়া
ঘুষের বিনিময়ে এমপিও, জালিয়াতির পাহাড়: তদন্তে অপরাধ ‘প্রমাণিত’ হলেও বহাল তবিয়তে মাউশির ৫ কর্মকর্তা

ভুয়া সনদ, ব্যাকডেট নিয়োগ ও ডিজিটাল জালিয়াতির মহোৎসব রাজশাহীতে; তদন্ত প্রতিবেদন জমার এক মাসেও মন্ত্রণালয় নীরব, ক্ষুব্ধ শিক্ষা সচেতন মহল

রাজশাহী অঞ্চলের শিক্ষা ব্যবস্থায় এমপিওভুক্তি বা MPO Enlistment-কে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা এক বিশাল দুর্নীতি সিন্ডিকেটের মুখোশ উন্মোচিত হয়েছে। ঘুষ লেনদেন, তথ্য জালিয়াতি এবং সরকারি বিধিমালাকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে অবৈধ নিয়োগ বাণিজ্যের অভিযোগ দালিলিকভাবে প্রমাণিত হয়েছে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের (মাউশি) নিজস্ব তদন্তেই। অথচ, তদন্ত প্রতিবেদন বা Investigation Report জমা দেওয়ার এক মাস পেরিয়ে গেলেও অভিযুক্ত পাঁচ প্রভাবশালী কর্মকর্তার বিরুদ্ধে কোনো দৃশ্যমান প্রশাসনিক বা আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। অপরাধ প্রমাণিত হওয়ার পরেও তাদের স্বপদে বহাল থাকা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে খোদ শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের স্বচ্ছতা নিয়ে।

অভিযুক্ত যারা এবং তদন্তের প্রেক্ষাপট

মাউশির উচ্চপর্যায়ের তদন্তে যে পাঁচ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে গুরুতর অনিয়মের প্রমাণ মিলেছে, তারা হলেন—মাউশি রাজশাহী অঞ্চলের তৎকালীন পরিচালক (কলেজ) বিশ্বজিৎ ব্যানার্জি, সহকারী পরিচালক মো. আলমাছ উদ্দিন এবং সেসিপ (SESIP) প্রকল্পের তিন কর্মকর্তা মানিক চন্দ্র প্রামাণিক, মো. আসমত আলী ও মো. রাশেদুল ইসলাম।

প্রগতিশীল নাগরিক সমাজ ও একাধিক শিক্ষক সমিতির প্রতিনিধিদের সুনির্দিষ্ট অভিযোগের ভিত্তিতে চলতি বছরের ৬ ফেব্রুয়ারি তদন্ত শুরু হয়। রাজশাহী কলেজের অধ্যক্ষ অধ্যাপক মো. যহুর আলীর নেতৃত্বে গঠিত তিন সদস্যের কমিটি দীর্ঘ অনুসন্ধান ও Documentation Analysis শেষে গত ১৪ অক্টোবর প্রতিবেদন জমা দেয়। প্রতিবেদনে স্পষ্ট বলা হয়েছে, অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে আনীত প্রতিটি অভিযোগই ‘দালিলিকভাবে প্রমাণিত’।

জালিয়াতির অভিনব কৌশল: ‘ডাটা টেম্পারিং’ ও ‘ব্যাকডেট’ নিয়োগ

তদন্ত প্রতিবেদনে দুর্নীতির যে চিত্র উঠে এসেছে, তা রীতিমতো ভয়াবহ। দেখা গেছে, ব্যানবেইস (BANBEIS) Database-এ কোনো তথ্য না থাকার পরেও সম্পূর্ণ অবৈধভাবে ছয়জন প্রভাষক ও এক অফিস সহকারীকে এমপিওভুক্ত করা হয়েছে। এটি সরাসরি শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের নীতিমালার লঙ্ঘন।

সবচেয়ে বড় জালিয়াতির ঘটনা ঘটেছে নাচোল মহিলা কলেজে। সেখানে ২০১৭ সালে নিয়োগপ্রাপ্ত আটজন শিক্ষককে কাগজপত্রে কারসাজি করে ২০১৬ সালের ৩১ ডিসেম্বরের আগে নিয়োগ দেখানো হয়েছে। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্তি বা Affiliation পাওয়ার আগেই এই নিয়োগ প্রক্রিয়া সম্পন্ন করাকে কমিটি ‘স্পষ্ট জালিয়াতি’ হিসেবে চিহ্নিত করেছে। এছাড়া, এনটিআরসিএ (NTRCA)-এর সুপারিশ ছাড়া শিক্ষক নিয়োগ ২০১৬ সালের পর থেকে নিষিদ্ধ থাকলেও, মোজাহার হোসেন ডিগ্রি কলেজে ২০১৯ সালে নিয়োগ দিয়ে পাঁচজনকে এমপিওভুক্ত করা হয়েছে।

অস্বীকৃত বিশ্ববিদ্যালয়ের সনদ ও ডিজিটাল ঘুষ লেনদেন

তদন্তে আরও বেরিয়ে এসেছে যে, ইউজিসি (UGC) কর্তৃক অনুমোদিত নয় এমন দুটি বিশ্ববিদ্যালয়—‘দ্য ইউনিভার্সিটি অব কুমিল্লা’ এবং ‘অতীশ দীপংকর বিশ্ববিদ্যালয়’ থেকে ডিগ্রি নেওয়া দুই শিক্ষককে এমপিও সুবিধা দেওয়া হয়েছে। এই প্রতিষ্ঠানগুলোর সনদ Blacklisted বা প্রশ্নবিদ্ধ হওয়া সত্ত্বেও অর্থের বিনিময়ে তাদের বৈধতা দেওয়া হয়।

তদন্ত প্রতিবেদনে ঘুষ লেনদেনের সপক্ষে Digital Evidence পাওয়ার কথাও উল্লেখ করা হয়েছে। নাটোরের মহারাজা জে. এন. কলেজের এক শিক্ষকের এমপিওভুক্তি নিশ্চিত করতে ৪ লাখ টাকা ঘুষ দাবির অভিযোগ ওঠে। কলেজের অধ্যক্ষ লিখিত জবানবন্দিতে জানিয়েছেন, সহকারী পরিচালক মো. আলমাছ উদ্দিনের উপস্থিতিতে সেসিপ কর্মকর্তা মানিক চন্দ্র প্রামাণিক এই অর্থ দাবি করেন। পরবর্তীতে হোয়াটসঅ্যাপ চ্যাটের (WhatsApp Chat) কথোপকথন বিশ্লেষণ করে তদন্ত কমিটি অর্থ নিয়ে বিরোধ ও লেনদেনের সত্যতা পায়।

দায়িত্ব এড়ানোর খেলা ও আমলাতান্ত্রিক জটিলতা

এত বড় অপরাধ প্রমাণিত হওয়ার পরেও ব্যবস্থা না নেওয়ায় হতাশ তদন্ত কমিটি ও অভিযোগকারীরা। তদন্ত কমিটির প্রধান অধ্যাপক মো. যহুর আলী বলেন, “প্রতিবেদনটি আমাদের স্বাক্ষরযুক্ত এবং সেখানে সব অভিযোগই প্রমাণিত হয়েছে। এখন বল কর্তৃপক্ষের কোর্টে।”

অন্যদিকে, মাউশির সহকারী পরিচালক (কলেজ-২) ফজলুল হক মনি জানান, তাদের দায়িত্ব ছিল কেবল প্রতিবেদন মন্ত্রণালয়ে ফরোয়ার্ড করা। তবে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের নিরীক্ষা ও আইন শাখার উপসচিব আশরাফুল ইসলাম জানান, বিষয়টি সম্পর্কে তিনি এখনো অবহিত নন এবং আগামী রোববার প্রতিবেদন দেখে মন্তব্য করবেন।

ভুক্তভোগী ও শিক্ষা সংশ্লিষ্টদের প্রশ্ন, ‘জিরো টলারেন্স’ বা Zero Tolerance নীতির কথা বলা হলেও, দুর্নীতির অকাট্য প্রমাণ থাকার পরেও কেন এই আমলাতান্ত্রিক দীর্ঘসূত্রতা? এই কালক্ষেপণ কি তবে অপরাধীদের রক্ষার কোনো কৌশলী প্রয়াস?

Tags: mpo corruption dshe rajshahi education ministry fake certificate bribery scandal ntrca banbeis investigation report bangladesh education news