জ্বালানি সংকটে জর্জরিত পাকিস্তানের অর্থনীতিতে নতুন আশার আলো। প্রথমবারের মতো সমুদ্রবক্ষে ‘কৃত্রিম দ্বীপ’ বা Artificial Island নির্মাণের এক উচ্চাভিলাসী প্রকল্প হাতে নিয়েছে দেশটি। মূলত গভীর সমুদ্রে তেল ও গ্যাস অনুসন্ধানের কাজকে গতিশীল করতেই এই নজিরবিহীন উদ্যোগ। পাকিস্তানের রাষ্ট্রীয় জ্বালানি কোম্পানি, পাকিস্তান পেট্রোলিয়াম লিমিটেড (পিপিএল) এই মেগা প্রজেক্ট বাস্তবায়ন করছে।
মার্কিন প্রভাবশালী সংবাদমাধ্যম ব্লুমবার্গের এক প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে, সিন্ধু উপকূলের সুজ্জাল এলাকা থেকে প্রায় ৩০ কিলোমিটার দূরে গভীর সমুদ্রে এই দ্বীপটি গড়ে তোলা হচ্ছে। এটি পাকিস্তানের Energy Sector বা জ্বালানি খাতের ইতিহাসে একটি মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
আবুধাবির আদলে প্রযুক্তিগত স্থাপত্য
ইসলামাবাদে অনুষ্ঠিত সাম্প্রতিক এক তেল ও গ্যাস সম্মেলনে পিপিএলের জেনারেল ম্যানেজার (এক্সপ্লোরেশন অ্যান্ড কোর বিজনেস ডেভেলপমেন্ট) আর্শাদ পালেকার এই প্রকল্পের বিস্তারিত তুলে ধরেন। তিনি জানান, মধ্যপ্রাচ্যের আবুধাবিতে সফলভাবে বাস্তবায়িত কৃত্রিম দ্বীপ প্রকল্পের প্রযুক্তি ও নকশা থেকে অনুপ্রাণিত হয়েই পাকিস্তান এই পথে হেঁটেছে।
প্রস্তাবিত দ্বীপটি সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে অন্তত ছয় ফুট উঁচু একটি শক্তিশালী Platform হিসেবে কাজ করবে। এর মূল উদ্দেশ্য হলো, সমুদ্রের উত্তাল ঢেউ বা High Tide-এর প্রভাব কাটিয়ে বছরের ৩৬৫ দিনই যেন নিরবচ্ছিন্নভাবে অনুসন্ধান ও খনন কার্যক্রম চালানো যায়, তা নিশ্চিত করা। পালেকার জানান, আগামী ফেব্রুয়ারি মাসের মধ্যেই দ্বীপটির নির্মাণকাজ সম্পন্ন হওয়ার কথা রয়েছে। এরপরই সেখানে পুরোদমে Drilling Operations শুরু হবে। প্রাথমিক পরিকল্পনায় এই দ্বীপটিকে কেন্দ্র করে প্রায় ২৫টি তেল-গ্যাস কূপ খননের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে।
ট্রাম্পের মন্তব্য এবং অনুসন্ধানে নতুন গতি
পাকিস্তানের এই হঠাৎ তোড়জোড়ের পেছনে ভূ-রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক প্রেক্ষাপটও রয়েছে। গত জুলাই মাসে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নবনির্বাচিত প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প পাকিস্তানের ভূগর্ভস্থ সম্পদের বিষয়ে একটি তাৎপর্যপূর্ণ মন্তব্য করেছিলেন। তিনি উল্লেখ করেছিলেন, পাকিস্তানে ‘বিপুল তেলের মজুদ’ বা Massive Oil Reserves থাকার সম্ভাবনা রয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, ট্রাম্পের ওই মন্তব্যের পরই নড়েচড়ে বসে পাকিস্তান সরকার। Offshore Exploration বা সমুদ্রতীরে তেল-গ্যাস অনুসন্ধানে নতুন করে গতি সঞ্চার হয়। এরই ধারাবাহিকতায় সরকার দ্রুততম সময়ের মধ্যে তিনটি স্থানীয় কোম্পানিকে অফশোর অনুসন্ধানের লাইসেন্স প্রদান করে। কোম্পানিগুলো হলো—পাকিস্তান পেট্রোলিয়াম লিমিটেড (পিপিএল), মেরি এনার্জিস লিমিটেড এবং প্রাইম ইন্টারন্যাশনাল অয়েল অ্যান্ড গ্যাস কোম্পানি।
জ্বালানি খাতের বৃহত্তর চিত্র
শুধু অনুসন্ধানই নয়, জ্বালানি পরিশোধন বা Refining Sector-এও পাকিস্তান আন্তর্জাতিক অংশীদারিত্ব বাড়াচ্ছে। বৈশ্বিক জ্বালানি জায়ান্ট ‘ভিটল’ জানিয়েছে, তারা পাকিস্তানের বৃহত্তম তেল রিফাইনারি ‘সিএনার্জিকো’-র সঙ্গে যৌথভাবে কাজ করছে। এর অংশ হিসেবে পাকিস্তানের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো রেকর্ড পরিমাণ ‘ভেরি-লো সালফার ফুয়েল অয়েল’ (ভিএলএসএফও) এর চালান সরবরাহ করা হয়েছে।
অর্থনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, কৃত্রিম দ্বীপের মাধ্যমে যদি পাকিস্তান উল্লেখযোগ্য পরিমাণ তেল বা গ্যাসের সন্ধান পায়, তবে তা দেশটির ভঙ্গুর অর্থনীতিকে ঘুরে দাঁড়াতে এবং আমদানি নির্ভরতা কমাতে ‘গেম চেঞ্জার’ হিসেবে ভূমিকা রাখবে।