পুরান ঢাকার বংশালে বহুতল ভবনের রেলিং ভেঙে মুহূর্তেই চুরমার একটি পরিবারের স্বপ্ন। গুরুতর আহত মা জানেন না, তাঁর আদরের সন্তান আর বেঁচে নেই।
নিয়তর এক নির্মম পরিহাস! হাসপাতালের অপারেশন থিয়েটারে তীব্র যন্ত্রণায় কাতরাচ্ছেন মা নুসরাত। আর কয়েক হাত দূরেই মর্গের হিমশীতল কক্ষে নিথর দেহে পড়ে আছে তাঁর একমাত্র ছেলে রাফিউল ইসলাম রাফির মরদেহ। জ্ঞান ফিরতেই মা বারবার জানতে চাইছেন, ‘আমার রাফি কই, ও কেমন আছে?’ কিন্তু কে দেবে এই কঠিন প্রশ্নের উত্তর? তিনি জানেন না, কয়েক মুহূর্তের একটি ভূমিকম্প তাঁর পৃথিবীটাকেই চিরতরে তছনছ করে দিয়ে গেছে।
শুক্রবার সকাল ১০টা ৩৮ মিনিটে রাজধানী ঢাকাসহ দেশব্যাপী বয়ে যাওয়া শক্তিশালী ভূমিকম্প কেড়ে নিয়েছে স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজের ৫২তম ব্যাচের মেধাবী শিক্ষার্থী রাফির প্রাণ। এই অকল্পনীয় বিপর্যয় স্তব্ধ করে দিয়েছে তাঁর পরিবার, বন্ধু ও সহপাঠীদের।
এক মুহূর্তের কাঁপুনিতে দুঃস্বপ্নের হানা
প্রত্যক্ষদর্শী ও রাফির সহপাঠী অপু জানান, শুক্রবার সকালে রাফি তাঁর মায়ের সঙ্গে পুরান ঢাকার বংশালের কসাইটুলি এলাকার নয়নের মাংসের দোকানে গিয়েছিলেন। দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে থাকাকালীনই তীব্র মাত্রায় ভূমিকম্প শুরু হয়। কিছু বুঝে ওঠার আগেই পাশের একটি পাঁচতলা পুরোনো ভবনের কার্নিশ ও রেলিংয়ের একটি বড় অংশ সরাসরি তাঁদের ওপর ভেঙে পড়ে। বিকট শব্দে চারপাশ কেঁপে উঠলে স্থানীয়রা ছুটে এসে তাঁদের ধ্বংসস্তূপের নিচ থেকে উদধার করে দ্রুত মিটফোর্ড হাসপাতালে নিয়ে যান। কিন্তু ততক্ষণে সব শেষ। হাসপাতালের জরুরি বিভাগে কর্তব্যরত চিকিৎসকেরা রাফিকে মৃত ঘোষণা করেন। তাঁর মাথার সামনের অংশ ও মুখমণ্ডল মারাত্মকভাবে থেঁতলে গিয়েছিল।
অপারেশন থিয়েটারে মায়ের আকুতি
হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, দুর্ঘটনায় রাফির মা নুসরাতের শরীরের একাধিক স্থানে গুরুতর আঘাত লেগেছে। তাঁকে দ্রুত অপারেশন থিয়েটারে নেওয়া হয় এবং তাঁর চিকিৎসা চলছে। শারীরিক যন্ত্রণার চেয়েও তাঁকে বেশি পীড়া দিচ্ছে ছেলের জন্য উদ্বেগ। তিনি এখনও জানেন না যে, যে ছেলেকে নিয়ে তাঁর এত স্বপ্ন, সে আর কোনোদিন 'মা' বলে ডাকবে না। চিকিৎসকেরা জানিয়েছেন, তিনি প্রচণ্ড মানসিক ট্রমার মধ্যে আছেন, তাই এই মুহূর্তে তাঁকে ছেলের মৃত্যুর সংবাদ জানানো সম্ভব নয়।
এদিকে, এই মর্মান্তিক খবর পেয়ে হাসপাতালে ছুটে এসেছেন রাফির একমাত্র বোন। ভাইয়ের নিথর দেহ আর মায়ের যন্ত্রণাকাতর অবস্থা দেখে শোকে পাথর হয়ে গেছেন তিনি। এক দুটি এমন ভয়াবহ দৃশ্য তাঁর কৈশোরের সব আনন্দকে যেন কেড়ে নিয়েছে। বগুড়ার গ্রামের বাড়িতে থাকা রাফির বাবাও ঢাকার পথে রওনা হয়েছেন, যিনি চাকরির সুবাদে দিনাজপুরে কর্মরত।
ভূমিকম্পের কেন্দ্র ও ক্ষয়ক্ষতির বিবরণ
বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদফতর জানিয়েছে, সকাল ১০টা ৩৮ মিনিট ২৬ সেকেন্ডে অনুভূত হওয়া এই ভূমিকম্পের উৎপত্তিস্থল ছিল নরসিংদীর মাধবদীতে। রিখটার স্কেলে এর মাত্রা ছিল ৫.৭, যা মাঝারি শক্তির ভূমিকম্প হিসেবে বিবেচিত। এই ভূমিকম্পে রাজধানীর বিভিন্ন স্থানে ভবন হেলে পড়া ও ফাটল ধরার খবর পাওয়া গেছে।
বংশাল থানার পুলিশ জানিয়েছে, কসাইটুলির ওই দুর্ঘটনায় রাফিসহ মোট তিনজন পথচারী নিহত হয়েছেন। নিহত বাকি দুজনের মধ্যে একজন শিশু থাকলেও তাঁদের পূর্ণাঙ্গ পরিচয় তাৎক্ষণিকভাবে নিশ্চিত করা যায়নি। পুলিশের লালবাগ বিভাগের সহকারী কমিশনার (ডিসি) মল্লিক আহসান উদ্দিন সামি ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে জানান, ভবনের সানসেট ভেঙে পড়ার ঘটনায় মোট তিনজনের মৃত্যু হয়েছে, যার মধ্যে দুজন ঘটনাস্থলেই এবং একজন হাসপাতালে নেওয়ার পর মারা যান।