শীতের আমেজ গায়ে মাখতে কার না ভালো লাগে? কিন্তু এই আরামদায়ক আবহাওয়াই আপনার শরীরের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ কিডনির জন্য ডেকে আনতে পারে বড় বিপদ। চিকিৎসা বিজ্ঞানীদের মতে, বছরের অন্যান্য সময়ের তুলনায় শীতকালেই কিডনিতে পাথর বা Kidney Stone জমার প্রবণতা সবচেয়ে বেশি দেখা যায়। আপাতদৃষ্টিতে শীতকালকে স্বস্তিদায়ক মনে হলেও, এই সময়ে আমাদের জীবনযাত্রার কিছু পরিবর্তন অজান্তেই কিডনিকে ঝুঁকির মুখে ঠেলে দেয়।
কেন বাড়ে ঝুঁকি? নেপথ্যের বিজ্ঞান
শীতকালে কিডনিতে পাথর জমার প্রধান এবং অন্যতম কারণ হলো Dehydration বা পানিশূন্যতা। ঠান্ডা আবহাওয়ায় আমাদের শরীর থেকে ঘাম কম নির্গত হয় এবং স্বাভাবিকভাবেই আমাদের তৃষ্ণা বা পানির পিপাসা কমে যায়। ফলে অধিকাংশ মানুষই প্রয়োজনের তুলনায় অনেক কম পানি পান করেন।
‘এনভায়রনমেন্টাল হেলথ ইনসাইট’ (Environmental Health Insights) জার্নালে প্রকাশিত একটি সাম্প্রতিক গবেষণাপত্রে বলা হয়েছে, শীতকালে পানি কম খাওয়ার ফলে মূত্র বা ইউরিন অতিরিক্ত ঘন (Concentrated) হয়ে পড়ে। এই ঘন মূত্রে থাকা ক্যালশিয়াম, অক্সালেট এবং ইউরিক অ্যাসিড সঠিকভাবে শরীর থেকে বের হতে পারে না। ফলে এগুলো জমাট বেঁধে ক্রিস্টাল বা দানাদার আকার ধারণ করে, যা ধীরে ধীরে পাথরে রূপান্তরিত হয়। ঋতু পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে এই ‘স্টোন’ ফরমেশনের হারের যে ওঠানামা, তা এই গবেষণায় স্পষ্টভাবে উঠে এসেছে।
গবেষণা কী বলছে?
‘ক্লিনিক্যাল জার্নাল অব দ্য আমেরিকান সোসাইটি অব নেফ্রোলজি’-তে প্রকাশিত আরেকটি গবেষণায় বলা হয়েছে, শুধু পানি কম খাওয়া নয়, শীতকালীন খাদ্যাভ্যাসও এর জন্য দায়ী। অতিরিক্ত Sodium বা লবণ গ্রহণ, প্রাণিজ প্রোটিন বা Animal Protein খাওয়ার প্রবণতা এবং শরীরচর্চার অভাব—এই তিনটি বিষয়কে কিডনিতে পাথর তৈরির প্রধান অনুঘটক বা ‘ক্যাটালিস্ট’ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন গবেষকরা।
ঝুঁকি এড়াতে বিশেষজ্ঞদের ৪ পরামর্শ
শীতের এই মৌসুমে কিডনিকে সুস্থ ও সচল রাখতে এবং পাথরের ঝুঁকি কমাতে চিকিৎসকরা চারটি সুনির্দিষ্ট Health Protocol মেনে চলার পরামর্শ দিয়েছেন:
১. হাইড্রেটেড থাকা বাধ্যতামূলক শীতে পিপাসা না পেলেও নিয়ম করে পানি পান করতে হবে। বিশেষজ্ঞদের মতে, দিনে অন্ততপক্ষে ৮ থেকে ১০ গ্লাস পানি পান করা জরুরি। শুধু সাধারণ পানি নয়, খাদ্যতালিকায় Detox Water, ভেষজ চা বা Herbal Tea এবং ফলের রস যুক্ত করা যেতে পারে। এটি শরীরে তরলের ভারসাম্য বজায় রাখতে এবং ইউরিন ডাইলুটেড বা পাতলা রাখতে সহায়তা করে।
২. সোডিয়াম ও প্রসেসড ফুড বর্জন লবণ বা সোডিয়াম কিডনির অন্যতম শত্রু। রক্তে সোডিয়ামের মাত্রা বেড়ে গেলে কিডনিতে পাথর হওয়ার ঝুঁকি বহুগুণ বেড়ে যায়। তাই রান্নায় অতিরিক্ত লবণ এবং প্যাকেটজাত বা Processed Food (যেমন—চিপস, সসেজ, ক্যানড ফুড) পরিহার করতে হবে। শীতের সময় ফাস্টফুড খাওয়ার প্রবণতা বাড়ে, যা নিয়ন্ত্রণ করা অত্যন্ত জরুরি।
৩. সাইট্রাস ফলের ‘রক্ষা কবচ’ কিডনিতে পাথর জমার প্রবণতা রুখতে Citrus Fruits বা লেবুজাতীয় ফল (যেমন—কমলা, মাল্টা, বাতাবি লেবু) অত্যন্ত কার্যকর। এসব ফলে প্রচুর পরিমাণে ভিটামিন-সি এবং সাইট্রেট থাকে। সাইট্রেট প্রাকৃতিকভাবে কিডনিতে পাথর বা ক্রিস্টাল জমতে বাধা দেয়। পাশাপাশি, ভিটামিন-সি মূত্রাশয়ের সংক্রমণ বা Urinary Tract Infection প্রতিরোধেও সহায়তা করে।
৪. সক্রিয় জীবনযাপন বা অ্যাক্টিভ লাইফস্টাইল শীতের অলসতায় অনেকেই শরীরচর্চা থেকে দূরে থাকেন। কিন্তু স্থূলতা বা Obesity কিডনির ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করে। দীর্ঘক্ষণ এক জায়গায় বসে থাকা বা Sedentary Lifestyle কিডনির কার্যক্ষমতা কমিয়ে দেয়। তাই কিডনি ভালো রাখতে হলে নিয়মিত হাঁটাচলা এবং হালকা ব্যায়ামের মাধ্যমে শরীরের ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখা আবশ্যক।