• আন্তর্জাতিক
  • খনির বিষে দক্ষিণপূর্ব এশিয়ার নদী, মানুষ বড় ঝুঁকিতে, বলছে গবেষণা

খনির বিষে দক্ষিণপূর্ব এশিয়ার নদী, মানুষ বড় ঝুঁকিতে, বলছে গবেষণা

আন্তর্জাতিক ১ মিনিট পড়া
খনির বিষে দক্ষিণপূর্ব এশিয়ার নদী, মানুষ বড় ঝুঁকিতে, বলছে গবেষণা

দক্ষিণপূর্ব এশিয়ার মূলভূখণ্ডে ২ হাজার ৪০০-র বেশি খনি রয়েছে। এর অনেকগুলোতেই অবৈধ ও অনিয়ন্ত্রিত উপায়ে খনন কাজ চলে।

থাইল্যান্ডের উত্তরাঞ্চলের ৫৯ বছর বয়সী কৃষক তিপ কামলুয়ে জীবনের প্রায় পুরোটা সময়ই তার জমি সেচ দিয়েছেন কোক নদীর পানি দিয়ে; প্রতিবেশী মিয়ানমার থেকে আসা কোক পরে মেকং নদীর সঙ্গে একত্রিত হয়ে দক্ষিণপূর্ব এশিয়ার নানা দেশে প্রবাহিত হয়েছে। নদীর পানি ব্যবহারের সেই ‘সুখ’ এ বছর শেষ হয়ে গেছে। দূষণজনিত কারণে কর্তৃপক্ষ কোক নদীর পানি ব্যবহার বন্ধ করতে বলার পর তিপকে এপ্রিল থেকে তার কুমড়ো, রসুন, ভুট্টা আর ভেন্ডি চাষে ভূগর্ভস্থ পানি ব্যবহার করতে হচ্ছে।

“যেন আমার অর্ধেকটাই মরে গেছে,” থা টন উপজেলায় নিজের ক্ষেতের পাশে দাঁড়িয়ে বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে এমনটাই বলেছেন তিপ। সেসময় তিনি নদীটির দিকেই তাকিয়ে ছিলেন, যেটি আর ব্যবহার করা যাচ্ছে না।

কোক নদীর এই দূষণের পেছনে খনির নানান বিষাক্ত পদার্থের বড় ভূমিকা থাকতে পারে বলে মত গবেষকদের। দক্ষিণপূর্ব এশিয়ার মূলভূখণ্ডে ২ হাজার ৪০০-র বেশি খনি রয়েছে। এর অনেকগুলোতেই অবৈধ ও অনিয়ন্ত্রিত উপায়ে খনন কাজ চলে। এ খনিগুলো থেকে নদীর পানিতে সায়ানাইড ও পারদের মতো প্রাণঘাতী রাসায়নিক যাওয়ার সম্ভাবনা প্রবল বলে ধারণা মিলেছে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক থিংকট্যাঙ্ক স্টিমসন সেন্টারের গবেষণায়। গবেষণাটি সোমবার প্রকাশিত হয়েছে।

“এর ব্যাপকতার কথা ভাবলে হতভম্ব হয়ে পড়ি,” মেকং, ইরাবতী ও সালউইনের মতো যে বড়ো নদীগুলোতে দূষণের মাত্রা ব্যাপক হওয়ার সম্ভাবনা প্রকট, সেগুলোর অনেক শাখা-প্রশাখা থাকার দিকে ইঙ্গিত করে বলেন স্টিমসনের জ্যেষ্ঠ ফেলো ব্রায়ান এইলার।

স্টিমসনের এ প্রতিবেদন মূলত দক্ষিণপূর্ব এশিয়ার স্থলভাগে থাকা সম্ভাব্য দূষণকারী খনিগুলো নিয়ে সবচেয়ে বিস্তৃত গবেষণা। এতে গবেষকরা মেকং নদীর অববাহিকায় রাসায়নিক নির্গত করা ৩৬৬টি অ্যালুভিয়াল বা পলিমাটি খনি, ৩৫৯টি হিপ লিচ ও ৭৭টি বিরল ভৌত পদার্থের খনির কার্যক্রম উপগ্রহের ছবির সাহায্যে বিশ্লেষণ করেছেন।

বেশিরভাগ অ্যালুভিয়াল খনি থেকেই মূলত সোনা উত্তোলন করা হয়ে, তবে কিছু কিছু থেকে টিন ও রুপাও মেলে। হিপ লিচ খনিগুলো থেকে উত্তোলিত হয় সোনা, নিকেল, তামা ও ম্যাঙ্গানিজ। এশিয়ার তৃতীয় বৃহত্তম নদী মেকংয়ের ওপর ৭ কোটির বেশি মানুষ সরাসরি নির্ভরশীল। বিশ্বব্যাপী রপ্তানি হওয়া কৃষি ও মৎস্যজাত পণ্যের অন্যতম বড় উৎসও নদীটি।

“আগে একে একটি পরিচ্ছন্ন নদী হিসেবে ধরা হতো। “মেকং অববাহিকার বড় একটি অংশ কার্যত কোনো দেশের আইন বা যথাযথ নিয়ন্ত্রণে নেই, এ কারণে এখানে অনিয়ন্ত্রিত কার্যক্রমের অনুকূল পরিস্থিতি বিরাজ করছে, এবং এটা যে কত বড় পরিসরে, কী ব্যাপক আকারে হচ্ছে তা আমাদের তথ্যে বেরিয়ে এসেছে,” বলেছেন এইলার।

অনিয়ন্ত্রিত বিরল ভৌত পদার্থের খনি থেকে অ্যামোনিয়াম সালফাইডের মতো বিষাক্ত রাসায়নিক বের হয়, এদিকে দুই পদ্ধতিতে সোনা উত্তোলনে ব্যবহার করা হয় সোডিয়াম সায়ানাইড ও পারদ, বলছেন স্টিমসনের গবেষকরা। এসব বিষাক্ত রাসায়নিকের কারণে কেবল মেকং সংশ্লিষ্ট দক্ষিণ এশিয়ার কোটি কোটি মানুষই বিপদে রয়েছে এমনটা নয়, অন্য দেশের ক্রেতারাও আছেন মারাত্মক ঝুঁকির মুখে।

“যুক্তরাষ্ট্রে এমন কোনো বড় সুপারমার্কেট নেই যেখানে মেকং অববাহিকা থেকে আসা পণ্য নেই, এসব পণ্যের মধ্যে আছে চিংড়ি, চাল ও মাছ,” বলেছেন এইলার। থাইল্যান্ডের সঙ্গে থাকা পাহাড়ি সীমান্তের কাছে অবস্থিত মিয়ানমারের পূর্বাঞ্চলে চীনের পৃষ্ঠপোষকতায় নতুন বিরল ভৌত পদার্থের খনি আবির্ভূত হওয়ার পরপরই থা টনের মতো কোক নদীর ভাটির দিককার এলাকায় দূষণের ঝুঁকি অনেক গবেষককে শুরুতেই উদ্বিগ্ন করে তোলে।

কোক নদীর পানির নমুনায় দূষণের কারণ দেখতে গিয়ে সেখানে আর্সেনিক, ডিসপোরিসিয়াম ও টারবিয়ামের উপস্থিতি পাওয়া গেছে, বলেছেন থাই সরকারি গবেষণা সংস্থা থাইল্যান্ড সায়েন্স রিসার্চ অ্যান্ড ইনোভেশনের তানাপোন ফেনরাত।

“কোক নদীর উৎসে মিয়ানমারে সোনা ও বিরল ভৌত পদার্থের খননকাজ বেড়ে যাওয়ার মাত্র দুই বছর হল,” বলেছেন চলতি বছর নদীর পানিতে বিভিন্ন পদার্থের উপস্থিতি নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালানো তানাপোন। খননকাজ বন্ধ না হলে দূষণের মাত্রা ব্যাপকহারে বাড়বে বলে সতর্কও করেছেন তিনি। তানাপোন স্টিমসনের গবেষণায় যুক্ত ছিলেন না।

২০২১ সালে সামরিক বাহিনী ক্ষমতা দখলের পর থেকে গৃহযুদ্ধে জড়ানো মিয়ানমার বিশ্বের যে দেশগুলো সবচেয়ে বেশি ভারি বিরল ভৌত পদার্থ উত্তোলন করে তার একটি। দুর্লভ এ খনিজ পদার্থ দিয়ে বানানো চুম্বক বায়ুবিদ্যুৎ উৎপাদনে ব্যবহৃত টারবাইন, বৈদ্যুতিক গাড়ি ও প্রতিরক্ষা সরঞ্জামে লাগে।

মিয়ানমারের খনি থেকে কাঁচামাল নিয়ে যাওয়া হয় চীনে, সেখানেই তা দিয়ে বানানো হয় গুরুত্বপূর্ণ চুম্বক। এ পদ্ধতিতে চীনের একচেটিয়া কর্তৃত্ব আছে। যে কারণে বেইজিং যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে শুল্ক যুদ্ধেও এই বিরল ভৌত পদার্থকেই হাতিয়ার বানাতে পেরেছে।

Tags: খনি বিষ দক্ষিণপূর্ব এশিয়া নদী মানুষ ঝুঁকিতে গবেষণা