বাংলাদেশের ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে দেশে ফিরিয়ে আনার বিষয়ে আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়া শুরু করেছে ঢাকা। এ প্রেক্ষিতে বাংলাদেশের পাঠানো চিঠি বা Extradition Request হাতে পাওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করেছে ভারত। বুধবার (২৬ নভেম্বর) ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, তারা এই অনুরোধটি গ্রহণ করেছে এবং বর্তমানে সেটি তাদের বিচারিক ও আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে পর্যালোচনা করা হচ্ছে।
দিল্লির আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া ও আইনি প্রক্রিয়া
ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সোয়াল বুধবার এক সংবাদ সম্মেলনে এ বিষয়ে দিল্লির অবস্থান পরিষ্কার করেন। ভারতীয় প্রভাবশালী সংবাদমাধ্যম দ্য টেলিগ্রাফ ইন্ডিয়া এবং দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, জয়সোয়াল নিশ্চিত করেছেন যে শেখ হাসিনাকে ফেরানোর আনুষ্ঠানিক বার্তা তারা পেয়েছেন।
তিনি বলেন, “আমরা অনুরোধটি পেয়েছি এবং সেটি খতিয়ে দেখা হচ্ছে। এটি একটি আইনি বিষয়, তাই বিচারিক এবং অভ্যন্তরীণ আইনি প্রক্রিয়ার (Internal Legal Process) অংশ হিসেবেই এই চিঠির পর্যালোচনা চলছে।”
কূটনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ভারতের এই ‘পর্যালোচনা’র বার্তা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এর মাধ্যমে দিল্লি বুঝিয়ে দিল যে, বিষয়টি কেবল রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভরশীল নয়, বরং এর সঙ্গে দুই দেশের আইনি কাঠামো এবং প্রত্যর্পণ চুক্তির জটিল সমীকরণও জড়িত।
বাংলাদেশের জনগণের প্রতি প্রতিশ্রুতি ও কূটনৈতিক বার্তা
সংবাদ সম্মেলনে রণধীর জয়সোয়াল কেবল আইনি দিকটিই তুলে ধরেননি, বরং দুই দেশের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের গভীরতার কথাও স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন। তিনি স্পষ্টভাবে জানান, ভারত বাংলাদেশের জনগণের স্বার্থের প্রতি প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।
জয়সোয়াল বলেন, “আমরা বাংলাদেশের জনগণের প্রতি আমাদের অঙ্গীকারের জায়গায় অটল। এই বিষয়ে আমরা সব অংশীদার বা Stakeholders-এর সঙ্গে গঠনমূলক যোগাযোগ (Constructive Engagement) অব্যাহত রাখব।” ভারতের এই বক্তব্যে ইঙ্গিত মেলে যে, হাসিনাকে ফেরানোর বিষয়টি নিয়ে দিল্লির ওপর চাপ থাকলেও, তারা ঢাকার সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখার ক্ষেত্রে ভারসাম্যপূর্ণ নীতিই অনুসরণ করতে চায়।
জুলাই হত্যাযজ্ঞ ও মৃত্যুদণ্ডের প্রেক্ষাপট
এর আগে, গত জুলাই মাসে বাংলাদেশে সংঘটিত নজিরবিহীন ছাত্র-জনতার আন্দোলনে হত্যাযজ্ঞ চালানোর দায়ে শেখ হাসিনা এবং সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালকে অভিযুক্ত করে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল। এই মামলায় তাদের ‘ফাঁসির দণ্ড’ বা Capital Punishment ঘোষণা করা হয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে চিঠিতে। সেই রায়ের প্রেক্ষিতেই পলাতক আসামিদের দেশে ফিরিয়ে এনে দণ্ড কার্যকর করার উদ্যোগ নেয় অন্তর্বর্তীকালীন সরকার।
চিঠি পাঠানোর সময়রেখা
বাংলাদেশের পররাষ্ট্র উপদেষ্টা তৌহিদ হোসেন গত রোববার (২৩ নভেম্বর) গণমাধ্যমকে নিশ্চিত করেছিলেন যে, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের রায় কার্যকর করার লক্ষ্যে শেখ হাসিনাকে ফেরত চেয়ে শুক্রবার (২১ নভেম্বর) দিল্লিকে আনুষ্ঠানিক চিঠি পাঠানো হয়েছে।
পররাষ্ট্র উপদেষ্টা জানিয়েছিলেন, “চিঠিটি সরাসরি দিল্লিতে পাঠানো হয়েছে। এতে ট্রাইব্যুনালের রায় এবং জুলাইয়ের ঘটনার প্রেক্ষাপট উল্লেখ করে সাবেক প্রধানমন্ত্রীকে দেশে ফেরত পাঠানোর অনুরোধ জানানো হয়েছে।”
বাংলাদেশের এই অনুরোধের পর ভারতের আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া এবং ‘আইনি পর্যালোচনা’র কথা জানানোর ফলে দুই দেশের কূটনৈতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে আগামী দিনগুলো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হতে যাচ্ছে।