রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর দীর্ঘ এক যুগ ধরে আটকে থাকা রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের (রাবি/RU) এক সাবেক ছাত্রনেতার মাস্টার্স (Masters) পরীক্ষার ফল অবশেষে প্রকাশিত হয়েছে। শিক্ষকদের অন্তঃকোন্দল এবং রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতার কারণে ছাত্রত্ব বাতিল হওয়া সাবেক শিবির নেতা রফিকুল ইসলাম তার মাস্টার্স পরীক্ষায়ও বিভাগে প্রথম স্থান অধিকার করেছেন এবং সিজিপিএ-৪ (CGPA-4) অর্জন করেছেন।
বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রে জানা যায়, রফিকুল ইসলাম যখন জেলে ছিলেন, তখন তার স্নাতকের (Bachelor's) ফলাফল প্রকাশিত হয়, যেখানে তিনি ফার্স্টক্লাস ফার্স্ট (First Class First) হয়েছিলেন। কিন্তু এরপর শিক্ষকদের অন্তঃকোন্দল এবং তার রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতার অভিযোগে তার ছাত্রত্ব বাতিল করা হয়। থিসিস জালিয়াতির অভিযোগ এনে এই শাস্তি দেওয়ায় তিনি মাস্টার্সের জন্য দেশের কোনো পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হতে পারেননি।
ছাত্রত্ব পুনর্বহাল ও ফল প্রকাশ
ছাত্রত্ব বাতিলের শাস্তি মাথায় নিয়ে একসময় দেশ ছেড়েছিলেন রফিকুল ইসলাম। পরে তিনি চীনে গিয়ে মাস্টার্স শেষ করেন এবং বর্তমানে সৌদির কিং আব্দুল আজিজ বিশ্ববিদ্যালয়ে পিএইচডি (Ph.D.) করছেন।
রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পরে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন রফিকুল ইসলামের ছাত্রত্ব বাতিলের ঘটনা তদন্তের জন্য ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. ফজলুল হককে আহ্বায়ক করে তিন সদস্যবিশিষ্ট একটি তদন্ত কমিটি গঠন করে। এই রিভিউ কমিটির প্রতিবেদনের আলোকে গত ৬ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত বিশ্ববিদ্যালয়ের ৫৩৬তম সিন্ডিকেট সভায় (Syndicate Meeting) রফিকুল ইসলামের ছাত্রত্ব পুনর্বহাল ও তার পরীক্ষার অপ্রকাশিত ফল প্রকাশের সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়।
সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, দীর্ঘ এক যুগ পরে গত বুধবার (২৬ নভেম্বর) সন্ধ্যায় প্রকাশিত হয়েছে তার মাস্টার্সের ফল। রফিকুল ইসলাম রাবির ফলিত গণিত বিভাগের ২০০৭-০৮ বর্ষের শিক্ষার্থী এবং ছাত্রজীবনে তিনি রাজশাহী মহানগর ছাত্রশিবিরের (Chatra Shibir) শিক্ষা বিষয়ক সম্পাদকের দায়িত্বে ছিলেন।
বিশ্ববিদ্যালয়ের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক ড. মো. হাসনাত কবীর স্বাক্ষরিত বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, প্রার্থী এমএসসি (থিসিস গ্রুপ) পরীক্ষা, ২০১২ (যা অনুষ্ঠিত হয়েছিল আগস্ট-নভেম্বর, ২০১৩ এবং সেপ্টেম্বর-নভেম্বর, ২০২৫ মাসে)’তে উত্তীর্ণ হয়েছেন। তিনি ফলাফলে সিজিপিএ-৪ (আউট অব-৪) পেয়েছেন।
রফিকুল ইসলামের উচ্ছ্বাস ও কষ্টের ট্রমা
ফলাফল প্রকাশের পরে রফিকুল ইসলাম উচ্ছ্বাস প্রকাশ করে বলেন, “নিম্ন আয়ের আমার পরিবারের প্রথম প্রয়োজন ছিল আমার একটি ভালো ক্যারিয়ার (Career)। কিন্তু শিক্ষকদের অন্তঃকোন্দল এবং আমার রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতার কারণে আমার ওপর থিসিস জালিয়াতির অভিযোগ এনে ছাত্রত্ব বাতিল করা হয়। এতে আমার পরিবার বড় ধরনের ধাক্কা খায়। আমি এই ঘটনার পরে দীর্ঘদিন ট্রমার (Trauma) ভেতর ছিলাম।” তিনি এই ফল প্রকাশকে তার জীবনের অন্যতম আনন্দঘন সংবাদ বলে আল্লাহর কাছে শুকরিয়া জ্ঞাপন করেন।
তিনি তার পরবর্তী শিক্ষা জীবন উল্লেখ করে বলেন, “২০১৫ সালের শেষের দিকে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে উইকেন্ড প্রোগ্রামে (Weekend Program) মাস্টার্স সম্পন্ন করি এবং সেখানেও আমার সিজিপিএ-৪ আসে। এরপর আমি মানারাতে কিছুদিন কাটাই এবং পরে চীনে গিয়ে মাস্টার্স করি।” পরে দেশে ফিরে এসে বর্তমানে তিনি সৌদি আরবের কিং আব্দুল আজিজ বিশ্ববিদ্যালয়ে পিএইচডি করছেন।
এদিকে, তার ফল প্রকাশে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেছেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (রাকসু/RAKSU) ভিপি ও শাখা ছাত্রশিবিরের সভাপতি মোস্তাকুর রহমান জাহিদ। তিনি ফেসবুকের এক পোস্টে রফিকুল ইসলামের ওপর করা ফ্যাসিবাদী জুলুমের (Fascist Repression) যুগাবসান ঘটল বলে মন্তব্য করেন এবং ছাত্রশিবিরের বহু কর্মী এভাবে একাডেমিক হ্যারাসমেন্টের (Academic Harassment) শিকার হয়েছে বলে অভিযোগ তোলেন।