মাত্র ১৮ বছর বয়স। এই বয়সেই বিশ্ব ফুটবলের পাদপ্রদীপে লামিন ইয়ামাল। ক্লাব বার্সেলোনা এবং স্পেন জাতীয় দলের হয়ে যে অবিশ্বাস্য সাফল্য তিনি স্পর্শ করেছেন, অনেকের কাছে তা সারা জীবনের আরাধ্য। কিন্তু মুদ্রার উল্টো পিঠও আছে। অল্প বয়সের এই আকাশচুম্বী সাফল্য, অর্থ আর ‘Stardom’ (তারকাখ্যাতি)—সবকিছু সামলে রাখা চাট্টিখানি কথা নয়। ঠিক এই জায়গাতেই তরুণ ইয়ামালকে থামিয়ে দিয়ে জীবনের দামি পরামর্শটি দিলেন টেনিস দুনিয়ার অবিসংবাদিত সম্রাট রাফায়েল নাদাল।
টেনিস কিংবদন্তি নাদাল কেবল ইয়ামালের প্রশংসা করেই ক্ষান্ত হননি, বরং ভবিষ্যৎ কেরিয়ার নিয়ে দিয়েছেন কড়া সতর্কবার্তা। সাফল্যের চূড়ায় থেকেও কীভাবে পা মাটিতে রাখতে হয়, সেই ‘Guru Mantra’ যেন শুনিয়ে দিলেন জুনিয়র তারকাকে।
মাঠের বাইরের ‘গ্ল্যামার’ ও বিতর্কের ছায়া
মাঠের খেলায় লামিন ইয়ামাল যতটা উজ্জ্বল, সাম্প্রতিক সময়ে মাঠের বাইরের কর্মকাণ্ডে ঠিক ততটাই আলোচিত-সমালোচিত। কখনও প্রতিপক্ষকে নিয়ে বিতর্কিত মন্তব্য করে খবরের শিরোনাম হয়েছেন, আবার কখনও বিলাসী পার্টিতে উদ্দাম জীবনযাপনে মজেছেন। সম্প্রতি আর্জেন্টাইন গায়িকা নিকি নিকোলের সঙ্গে তার প্রেম ও ঘোরাঘুরির গুঞ্জন ‘Social Media’-তে ঝড় তুলেছে। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে চোটের আঘাত।
যদিও মাঠের পারফরম্যান্সে এখনও ভাটা পড়েনি, কিন্তু স্প্যানিশ ফুটবল বোদ্ধারা আশঙ্কা করছেন, মাঠের বাইরের এই ‘Distraction’ বা মনোযোগের বিচ্যুতি দীর্ঘমেয়াদে তার ক্যারিয়ারের জন্য কাল হতে পারে। ঠিক এই প্রেক্ষাপটেই মুখ খুলেছেন রাফায়েল নাদাল।
নাদালের পরামর্শ: প্রয়োজন সৎ ‘সাপোর্ট সিস্টেম’
স্প্যানিশ সংবাদমাধ্যম ‘মোভিস্টার’-কে দেয়া এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে নাদাল ইয়ামালের মানসিকতা ও পারিপার্শ্বিকতা নিয়ে কথা বলেন। নাদালের মতে, একজন তারকার চারপাশে এমন মানুষ থাকা প্রয়োজন, যারা তাকে মিথ্যা প্রশংসা নয়, বরং সত্যটা মুখের ওপর বলতে পারবে।
নাদাল বলেন, “তার চারপাশে এমন সব মানুষ থাকা দরকার, যারা সত্যিই তাকে সমর্থন করবে এবং সঠিক পথ দেখাবে। সফল মানুষেরা সচরাচর নিজেদের সমালোচনা বা অপ্রিয় সত্য কথা শুনতে পছন্দ করে না। কিন্তু ইয়ামালকে এতটাই বুদ্ধিমান হতে হবে যেন সে ওই রূঢ় সত্যগুলো গ্রহণ করতে পারে। তার চারপাশে এমন ‘Support System’ থাকা জরুরি, যারা সত্যিই তার ভালো চায়। আর ইয়ামালের মধ্যেও সেই মানুষদের কথা শোনার মতো ‘Mental Maturity’ বা মানসিক পরিপক্বতা থাকতে হবে।”
আলোর নিচে থাকা একজন কিশোরের জন্য এই ভারসাম্য বজায় রাখা যে মোটেও সহজ নয়, তা স্বীকার করে নিয়ে নাদাল যোগ করেন, “এটা কঠিন, কিন্তু তার উজ্জ্বল ভবিষ্যতের জন্য এটা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।”
সাফল্য যেন অসুখী হওয়ার কারণ না হয়
টেনিস কোর্টে ২২টি গ্র্যান্ড স্ল্যামের মালিক নাদাল খুব ভালো করেই জানেন খ্যাতির বিড়ম্বনা। তিনি মনে করিয়ে দেন, সাফল্য আর খ্যাতি মানুষকে গ্রাস করে ফেলতে পারে।
নাদালের ভাষ্যমতে, “তার পাশে এমন মানুষ থাকা দরকার, যারা তার উপকারে আসবে। তারা পরিবারের সদস্য হতে পারে কিংবা সতীর্থ। দেখুন, সবার বাস্তবতা আলাদা, সবার ‘Mentality’ আলাদা। সাফল্যের অনেক পথ আছে। কিন্তু সেই সাফল্য বা খ্যাতি কে কীভাবে ‘Handle’ করছে, সেটাই দিনশেষে ঠিক করে দেয় মানুষটা সুখী হবে নাকি অসুখী। কারণ, অনিয়ন্ত্রিত সাফল্য আর খ্যাতি একসময় আপনাকে গ্রাস করে ফেলতে পারে, আপনাকে মানসিকভাবে অসুখী করে তুলতে পারে।”
নাদালের নিজের অভিজ্ঞতা
রাফায়েল নাদাল যখন ইয়ামালকে এই উপদেশ দেন, তখন তা কেবল কথার কথা থাকে না। কারণ নাদাল নিজেও মাত্র ১৪ বছর বয়সে পেশাদার টেনিস শুরু করেছিলেন এবং ১৯ বছর বয়সে জিতেছিলেন নিজের প্রথম ফ্রেঞ্চ ওপেন। বিশ্ব র্যাঙ্কিংয়ের শীর্ষে থেকেও তিনি যেভাবে নিজেকে স্ক্যান্ডালমুক্ত রেখে দীর্ঘ দুই দশক রাজত্ব করেছেন, তা ক্রীড়াবিশ্বে এক অনন্য উদাহরণ। ইয়ামাল সেই উদাহরণ থেকে শিক্ষা নিয়ে নিজের গতিপথ ঠিক রাখবেন কি না, সেটাই এখন দেখার বিষয়।