সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম বা Social Media-এর নিউজফিড স্ক্রল করলেই গত কয়েকদিন ধরে চোখে পড়ছে এক অদ্ভুত দৃশ্য। দেশের জনপ্রিয় নারী তারকারা হঠাৎ করেই তাদের হাত কিংবা গালে বিভিন্ন সংখ্যা লিখে ছবি পোস্ট করছেন। আপাতদৃষ্টিতে কোনো নতুন ট্রেন্ড বা ফ্যাশন মনে হলেও, এই সংখ্যাগুলোর পেছনে লুকিয়ে আছে এক গভীর এবং তিক্ত সত্য। মূলত ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে প্রতিনিয়ত ঘটে যাওয়া সাইবার বুলিং (Cyber Bullying) এবং ডিজিটাল ভায়োলেন্সের বিরুদ্ধে এটি তারকাদের এক সম্মিলিত ও অভিনব প্রতিবাদ।
রহস্যময় সংখ্যার আড়ালে ‘ডিজিটাল ক্ষত’
নেটিজেনদের মনে প্রশ্ন জাগা স্বাভাবিক—হঠাৎ কেন এই সংখ্যা লিখন? জানা গেছে, এই সংখ্যাগুলো নিছক কোনো গাণিতিক হিসাব নয়, বরং এটি তারকাদের প্রাত্যহিক জীবনের এক অনভিপ্রেত অভিজ্ঞতার পরিসংখ্যান। একজন তারকা প্রতিদিন গড়ে কতবার সাইবার বুলিং বা Online Harassment-এর শিকার হচ্ছেন, শরীরে লেখা সংখ্যাটি মূলত সেই ভয়ানক অভিজ্ঞতারই নির্দেশক। এই অভিনব আন্দোলনের নাম দেওয়া হয়েছে— ‘মাই নাম্বার, মাই স্টোরি’ (My Number, My Story)।
‘মাই নাম্বার, মাই স্টোরি’: সংখ্যা যখন প্রতিবাদের ভাষা
নারী ও শিশু নির্যাতনের বিরুদ্ধে ১৬ দিনব্যাপী আন্তর্জাতিক প্রতিরোধ পক্ষের অংশ হিসেবে এই ক্যাম্পেইনটি শুরু হয়েছে। গত ২৫ নভেম্বর নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজ থেকে এই আন্দোলনের সূচনা করেন দেশের জনপ্রিয় অভিনেত্রী নুসরাত ইমরোজ তিশা। তিনি নিজের হাতে ‘৯’ সংখ্যাটি লিখে একটি ছবি পোস্ট করেন, যা দ্বারা তিনি বুঝিয়ে দিয়েছেন—প্রতিদিন অন্তত ৯ বার তিনি অনলাইনে কুরুচিপূর্ণ মন্তব্য বা বুলিংয়ের শিকার হন।
ছবির ক্যাপশনে তিশা অত্যন্ত আবেগঘন ও শক্তিশালী বার্তা প্রদান করেন। তিনি লেখেন, “সংখ্যা থেকে কণ্ঠস্বর, আসুন আমাদের গল্প সবার সামনে তুলে ধরি। তোমার নম্বরের গল্প বলো, আরও জোরে আওয়াজ তোলো। মানুষ হয়তো কেবল একটি সংখ্যা দেখতে পাচ্ছেন, কিন্তু আমি যা সহ্য করেছি এবং যা কাটিয়ে উঠেছি, তার সবই দেখতে পাচ্ছি।” তিনি তাঁর বক্তব্যে ‘হ্যাশট্যাগ’ ব্যবহার করে সবাইকে এই ডিজিটাল সহিংসতার বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়ার আহ্বান জানান।
ভুক্তভোগীর তালিকায় দীর্ঘ হচ্ছে তারকাদের নাম
তিশার এই সাহসিকতার পর শোবিজ অঙ্গনের অনেক তারকাই এই ক্যাম্পেইনে একাত্মতা প্রকাশ করেছেন। চলচ্চিত্র, নাটক এবং সংগীত জগতের পরিচিত মুখেরা নিজেদের ‘লজ্জা’ নয়, বরং ‘লড়াই’ হিসেবে এই সংখ্যাগুলো প্রকাশ করছেন। অভিনেত্রী রুনা খান তার হাতে লিখেছেন ‘২৪’, যার অর্থ দিনে ২৪ বার তিনি বিব্রতকর পরিস্থিতির মুখোমুখি হন।
তবে সবচেয়ে আঁতকে ওঠার মতো তথ্য দিয়েছেন অভিনেত্রী শবনম ফারিয়া ও আশনা হাবিব ভাবনা। ফারিয়া তার ছবিতে ‘১০০০’ সংখ্যাটি উল্লেখ করেছেন, যা সোশ্যাল মিডিয়ায় তার প্রতি নেতিবাচক আচরণের ভয়াবহ মাত্রাকে নির্দেশ করে। অন্যদিকে ভাবনা লিখেছেন ‘৯৯ প্লাস’, যা বুঝিয়ে দেয় হয়রানির কোনো সীমারেখা আর অবশিষ্ট নেই। এছাড়া চিত্রনায়িকা প্রার্থনা ফারদিন দীঘি ‘৩’, মৌসুমী হামিদ ‘৭২’ এবং কণ্ঠশিল্পী সাজিয়া সুলতানা পুতুল ‘৯’ লিখে নিজেদের তিক্ত অভিজ্ঞতার কথা শেয়ার করেছেন।
নেটিজেনদের আচরণ ও তারকাদের পর্যবেক্ষণ
এই ক্যাম্পেইন প্রসঙ্গে গণমাধ্যমের সঙ্গে আলাপকালে অভিনেত্রী রুনা খান গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয় তুলে ধরেন। তিনি মনে করেন, এই সমস্যাটি কেবল তারকাদের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, বরং সাধারণ নারীরাও নিয়মিত Social Media-তে হয়রানির শিকার হচ্ছেন।
রুনা খান বলেন, “গত এক দশকে স্মার্টফোন ও ইন্টারনেট মানুষের হাতে হাতে পৌঁছে গেছে সত্য, কিন্তু এর সঠিক ব্যবহারবিধি বা ‘ডিজিটাল এটিকেট’ অনেকেই শেখেননি। অন্যের ওয়ালে গিয়ে কুরুচিপূর্ণ মন্তব্য করা যে অপরাধ, সেই বোধশক্তি অনেকের মধ্যেই তৈরি হয়নি।”
জানা গেছে, সাইবার স্পেসে নারীদের নিরাপত্তা এবং মানসিক স্বাস্থ্য সুরক্ষার লক্ষ্যে ‘মাই নাম্বার, মাই স্টোরি’ শীর্ষক এই ডিজিটাল ক্যাম্পেইনটি টানা ১৬ দিন ধরে চলবে। শোবিজের গণ্ডি পেরিয়ে সাধারণ নারীদের মধ্যেও এই সচেতনতা ছড়িয়ে দেওয়াই এই আন্দোলনের মূল লক্ষ্য।