প্রকৃতির রুদ্ররোষে বিপর্যস্ত দক্ষিণ এশিয়ার দ্বীপরাষ্ট্র শ্রীলঙ্কা। গভীর নিম্নচাপ থেকে সৃষ্ট শক্তিশালী ঘূর্ণিঝড় ‘ডিটওয়াহ’ (Cyclone Ditwah) আছড়ে পড়েছে দেশটির উপকূলে, যার প্রলয়ংকরী তাণ্ডবে রীতিমতো ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে বিস্তীর্ণ জনপদ। শুক্রবার (২৮ নভেম্বর) সকাল থেকে শুরু হওয়া এই ঝড়ের প্রভাবে প্রবল জলোচ্ছ্বাস, হড়কা বান বা ‘ফ্ল্যাশ ফ্লাড’ এবং ভয়াবহ ভূমিধসে এখন পর্যন্ত অন্তত ৫৬ জনের প্রাণহানির খবর পাওয়া গেছে। নিখোঁজ রয়েছেন আরও অন্তত ২১ জন, যাদের বেঁচে থাকার সম্ভাবনা ক্ষীণ বলে আশঙ্কা করছে উদ্ধারকারী দল।
রাতের আঁধারে মৃত্যুফাঁদ: বাদুলায় ট্রাজেডি
গত এক সপ্তাহ ধরেই ভারী বর্ষণে নাকাল ছিল শ্রীলঙ্কা। তবে পরিস্থিতির চরম অবনতি ঘটে বৃহস্পতিবার মধ্যরাত থেকে। দেশটির দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কেন্দ্র (DMC) বা ডিজাস্টার ম্যানেজমেন্ট সেন্টার জানিয়েছে, ঘূর্ণিঝড়ের প্রভাবে বাদুল্লা (Badulla) জেলায় চা বাগান অধ্যুষিত এলাকায় ভয়াবহ ভূমিধসের ঘটনা ঘটে। রাতের আঁধারে পাহাড় ধসে মাটির নিচে চাপা পড়ে ঘুমন্ত মানুষ। কেবল এই এক জেলাতেই ২১ জনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিও ফুটেজগুলোতে দেখা যায়, বন্যার পানি শহরের প্রধান সড়কগুলোর ওপর দিয়ে তীব্র স্রোতে প্রবাহিত হচ্ছে, ভাসিয়ে নিয়ে যাচ্ছে ঘরবাড়ি ও গবাদিপশু। উদ্ধারকর্মীরা দুর্গম এলাকাগুলোতে পৌঁছাতে হিমশিম খাচ্ছেন। অনেক এলাকায় বিদ্যুৎ ও টেলিযোগাযোগ ব্যবস্থা পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে।
যোগাযোগ ব্যবস্থায় ধস ও রেড অ্যালার্ট
ঘূর্ণিঝড় ‘ডিটওয়াহ’-এর প্রভাবে গত ২৪ ঘণ্টায় দেশটির বেশ কিছু জায়গায় ৩০০ মিলিমিটারের বেশি বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। আবহাওয়া দফতরের তথ্যমতে, এটি প্রথমে একটি ‘ডিপ ডিপ্রেশন’ বা গভীর নিম্নচাপ হিসেবে শুরু হলেও দ্রুত শক্তি সঞ্চয় করে ঘূর্ণিঝড়ে রূপ নেয়।
প্রবল বাতাসের কারণে শ্রীলঙ্কার প্রধান বিমানবন্দর থেকে বেশ কিছু ‘ইন্টারন্যাশনাল ফ্লাইট’ বা আন্তর্জাতিক বিমান বাতিল ঘোষণা করা হয়েছে। ঝুঁকি এড়াতে স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়সহ সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠান অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ ঘোষণা করেছে কর্তৃপক্ষ। সরকারি হিসেবে, এখন পর্যন্ত দেশজুড়ে প্রায় ৪৪ হাজার মানুষ সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। বিশেষ করে দেশটির পূর্ব ও মধ্যাঞ্চল কার্যত পানির নিচে।
রাজধানী কলম্বো ঝুঁকিতে: জরুরি সতর্কতা
পরিস্থিতি আরও অবনতির দিকে যাচ্ছে বলে সতর্ক করেছে দেশটির সেচ বিভাগ। ঘূর্ণিঝড়ের মূল আঘাত কিছুটা স্তিমিত হলেও নদীর পানিস্তর বা ‘ওয়াটার লেভেল’ আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে। আগামী ৪৮ ঘণ্টার জন্য কেলানি নদী উপত্যকার (Kelani River Valley) নিম্নাঞ্চলের বাসিন্দাদের জন্য সর্বোচ্চ সতর্কতা বা ‘রেড অ্যালার্ট’ জারি করা হয়েছে।
ঝুঁকিপূর্ণ এলাকার তালিকায় রয়েছে খোদ রাজধানী কলম্বো। বন্যার পানি যেকোনো সময় রাজধানীতে ঢুকে পড়তে পারে—এমন আশঙ্কায় নিম্নাঞ্চলের বাসিন্দাদের দ্রুত উঁচু স্থানে বা নিরাপদ ‘শেল্টার হোম’-এ সরে যাওয়ার নির্দেশ দিয়েছে সরকার। চলমান এই প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলায় সেনাবাহিনী ও জরুরি উদ্ধারকারী দলকে সর্বোচ্চ প্রস্তুত রাখা হয়েছে।