বিশ্বজুড়ে নীরব ঘাতক হিসেবে পরিচিত ডায়াবেটিস বা বহুমূত্র রোগ। একবার শরীরে বাসা বাঁধলে সারাজীবন এই রোগের সঙ্গে লড়াই করে যেতে হয়। Blood Sugar নিয়ন্ত্রণে রাখতে রোগীদের নিয়মিত ওষুধ সেবন, কড়া ডায়েট চার্ট এবং নিয়মমাফিক Exercise-এর মধ্য দিয়ে যেতে হয়। অনেক ক্ষেত্রে নিতে হয় ইনসুলিনও। তবে এবার ডায়াবেটিস ব্যবস্থাপনায় এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছেন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা। তাঁরা বলছেন, জটিল কোনো ওষুধ নয়, দৈনন্দিন জীবনে পর্যাপ্ত জল পানের (Water Intake) সাধারণ অভ্যাসটিই রক্তে শর্করার মাত্রা নিয়ন্ত্রণে রাখতে চমকপ্রদ ভূমিকা পালন করতে পারে।
বিখ্যাত চিকিৎসা সাময়িকী ‘ডায়াবেটিস কেয়ার’ (Diabetes Care) জার্নালে প্রকাশিত এক সাম্প্রতিক গবেষণায় এই চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে এসেছে।
গবেষণার ফলাফল: জল পানেই কমবে ঝুঁকি
ডায়াবেটিস ও বিপাকীয় রোগ নিয়ে দীর্ঘ গবেষণার পর বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন, শরীরের আর্দ্রতা বা Hydration Level সরাসরি রক্তে গ্লুকোজের মাত্রাকে প্রভাবিত করে। গবেষণায় দেখা গেছে, যারা দৈনিক ১৫ আউন্স বা ২ কাপের কম জল পান করেন, তাদের শরীরে Hyperglycemia বা ব্লাড সুগার বেড়ে যাওয়ার ঝুঁকি—যারা পর্যাপ্ত জল পান করেন তাদের তুলনায় অন্তত ৩০ শতাংশ বেশি। অর্থাৎ, সামান্য একটু সচেতনতা এবং জলের গ্লাসটি হাতে তুলে নেওয়ার অভ্যাসই আপনাকে বড়সড় স্বাস্থ্যঝুঁকি থেকে রক্ষা করতে পারে।
কেন জল কম খেলে ব্লাড সুগার বাড়ে?
সাধারণ মানুষের মনে প্রশ্ন জাগতে পারে, জলের সঙ্গে রক্তের চিনির সম্পর্ক কী? গবেষকরা এর একটি চমৎকার বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা দিয়েছেন। মূল ‘কালপ্রিট’ হিসেবে তাঁরা চিহ্নিত করেছেন ‘ভেসোপ্রেসিন’ (Vasopressin) নামক একটি বিশেষ হরমোনকে।
যখন আমরা কম জল পান করি, তখন শরীর পানিশূন্যতা বা Dehydration রোধ করতে প্রাকৃতিকভাবেই ভেসোপ্রেসিন হরমোনের নিঃসরণ বাড়িয়ে দেয়। এই হরমোনটি শরীরকে জল ধরে রাখতে নির্দেশ দেয়। কিন্তু সমস্যার শুরু হয় তখনই, যখন এই হরমোনের প্রভাবে লিভার বা যকৃৎ রক্তে বাড়তি শর্করা উৎপাদন শুরু করে। অর্থাৎ, জল কম খাওয়ার ফলে শরীর মনে করে সে সংকটে আছে এবং শক্তির জোগান দিতে লিভারকে অতিরিক্ত গ্লুকোজ রিলিজ করতে বাধ্য করে, যা শেষ পর্যন্ত ব্লাড সুগার বাড়িয়ে দেয়।
বিশেষজ্ঞ পরামর্শ: রোজ কতটা জল পান জরুরি?
ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে এবং সামগ্রিক সুস্থতায় শরীরে জলের ভারসাম্য বজায় রাখা অপরিহার্য। তবে প্রত্যেকের শারীরিক গঠন অনুযায়ী জলের চাহিদা ভিন্ন হতে পারে। ‘ডায়াবেটিস কেয়ার’ জার্নালের গবেষণা এবং বিশেষজ্ঞদের সুপারিশ অনুযায়ী একটি আদর্শ পরিমাপ নির্ধারণ করা হয়েছে:
নারীদের ক্ষেত্রে: দৈনিক অন্তত ৬ থেকে ৭ গ্লাস জল পান করা উচিত।
পুরুষদের ক্ষেত্রে: শারীরিক গঠন ও মেটাবলিক হারের কারণে পুরুষদের জলের চাহিদা কিছুটা বেশি। তাদের ক্ষেত্রে দৈনিক ৬ থেকে ৮ গ্লাস বা তার কিছু বেশি জল পান করা ডায়াবেটিস ব্যবস্থাপনার জন্য অত্যন্ত ইতিবাচক।
বিশেষজ্ঞরা আরও পরামর্শ দিচ্ছেন, কেবল তেষ্টা পেলেই নয়, বরং সারা দিন নির্দিষ্ট সময় অন্তর অল্প অল্প করে জল পানের অভ্যাস গড়ে তোলা উচিত। এতে Kidney Function ভালো থাকে এবং শরীর থেকে টক্সিন বা বিষাক্ত পদার্থ বেরিয়ে যেতে সুবিধা হয়, যা পরোক্ষভাবে সুগার নিয়ন্ত্রণে সহায়তা করে।