প্রকৃতির রুদ্ররোষে বিপর্যস্ত দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া। প্রবল বর্ষণ, বন্যা এবং ভয়াবহ ভূমিধসে (Landslide) ইন্দোনেশিয়ায় মৃত্যুর সংখ্যা ২০০ ছাড়িয়ে গেছে। দেশটির সুমাত্রা দ্বীপে পরিস্থিতি সবথেকে ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। স্থানীয় সময় শনিবার (২৯ নভেম্বর) ইন্দোনেশিয়ার জাতীয় দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা সংস্থা বা বিএনপিবি (BNPB)-এর সর্বশেষ তথ্যে এই বিপুল প্রাণহানির বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়েছে। অন্যদিকে, ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলে ঘূর্ণিঝড় ‘ডিটওয়াহ’-এর আঘাতে লণ্ডভণ্ড হয়েছে শ্রীলঙ্কা, সেখানেও শতাধিক মানুষের প্রাণহানির খবর পাওয়া গেছে।
সুমাত্রায় মানবিক বিপর্যয়: ধসে পড়ছে পাহাড়
টানা ভারি বৃষ্টিপাতের ফলে ইন্দোনেশিয়ার সুমাত্রা দ্বীপের বিস্তীর্ণ অঞ্চল এখন জলের নিচে। পশ্চিম সুমাত্রা, উত্তর সুমাত্রা এবং আচেহ প্রদেশে বন্যা পরিস্থিতির চরম অবনতি ঘটেছে। পশ্চিম সুমাত্রার আঞ্চলিক দুর্যোগ প্রশমন সংস্থার মুখপাত্র ইলহাম ওহাব শুক্রবার রাতে এক প্রেস ব্রিফিংয়ে জানান, “পরিস্থিতি অত্যন্ত সংকটজনক। শুক্রবার রাত পর্যন্ত আমরা কেবল পশ্চিম সুমাত্রাতেই ৬১ জনের মৃত্যু নিশ্চিত করতে পেরেছি। এখনো অন্তত ৯০ জন নিখোঁজ রয়েছেন, যাদের খুঁজে বের করতে সর্বোচ্চ চেষ্টা চালাচ্ছে আমাদের ‘রেসকিউ টিম’।” এর আগে এই প্রদেশে মৃতের সংখ্যা ২৩ বলে জানানো হয়েছিল।
সবচেয়ে বড় আঘাতটি এসেছে উত্তর সুমাত্রায়। বিএনপিবি-এর অফিসিয়াল ইউটিউব চ্যানেলে প্রচারিত এক ‘মিডিয়া ব্রিফিং’-এ জানানো হয়, শুক্রবার পর্যন্ত উত্তর সুমাত্রায় ১১৬ জনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। সেখানে এখনো ৪২ জন নিখোঁজ রয়েছেন। এ ছাড়া আচেহ প্রদেশে অন্তত ৩৫ জনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। সব মিলিয়ে মৃতের সংখ্যা দ্রুত বাড়ছে এবং নিখোঁজদের জীবিত উদ্ধারের আশা ক্রমশ ক্ষীণ হয়ে আসছে।
উদ্ধার কাজে বাধার মুখে ‘ইমার্জেন্সি রেসপন্স’
প্রতিকূল আবহাওয়া এবং যোগাযোগ ব্যবস্থা বা ‘কমিউনিকেশন সিস্টেম’ ভেঙে পড়ায় উদ্ধারকাজ মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। হাজার হাজার মানুষ ঘরবাড়ি হারিয়ে এখন ‘বাস্তুচ্যুত’ (Displaced)। স্থানীয় সংবাদমাধ্যম জাকার্তা গ্লোব-এর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আকাশ ও স্থলপথে উদ্ধারকারী দলগুলো দুর্গত এলাকায় পৌঁছানোর আপ্রাণ চেষ্টা করছে। কিন্তু ভূমিধসের কারণে রাস্তাঘাট বন্ধ হয়ে যাওয়া এবং টেলিযোগাযোগ বিচ্ছিন্ন থাকায় অনেক প্রত্যন্ত গ্রামের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন করা সম্ভব হচ্ছে না। ইন্দোনেশিয়া ছাড়াও প্রতিবেশী মালয়েশিয়া এবং থাইল্যান্ডেও ভারি বৃষ্টিপাতের কারণে বন্যা পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে এবং সেখানেও প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছে।
শ্রীলঙ্কায় ঘূর্ণিঝড় ‘ডিটওয়াহ’-এর তাণ্ডব: ভারতের দিকে চোখ
এদিকে দক্ষিণ এশিয়ায় প্রকৃতির আরেক রূপ দেখল শ্রীলঙ্কা। শক্তিশালী ঘূর্ণিঝড় ‘ডিটওয়াহ’ (Cyclone Detwah)-এর প্রভাবে সৃষ্ট জলোচ্ছ্বাস ও ঝড়ো হাওয়ায় দ্বীপরাষ্ট্রটিতে ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ হয়েছে। শ্রীলঙ্কার দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা বিভাগ বা ডিএমসি (DMC)-এর বরাতে বার্তা সংস্থা এএফপি জানিয়েছে, এই প্রাকৃতিক দুর্যোগে দেশটিতে মৃতের সংখ্যা বেড়ে ১২৩ জনে দাঁড়িয়েছে। এখনো নিখোঁজ রয়েছেন অন্তত ১৩০ জন।
গত শুক্রবার (২৮ নভেম্বর) সকালে শ্রীলঙ্কার উপকূলীয় অঞ্চল দিয়ে বয়ে যায় ঘূর্ণিঝড়টি। ঝড়ের তাণ্ডবে হাজার হাজার ঘরবাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং বিদ্যুৎহীন হয়ে পড়েছে বিশাল এলাকা। দেশটির আবহাওয়া দপ্তর বা মেট অফিস জানিয়েছে, ধ্বংসযজ্ঞ চালানোর পর ঘূর্ণিঝড় ‘ডিটওয়াহ’ বর্তমানে শ্রীলঙ্কা অতিক্রম করে উত্তর দিকে সরে আসছে এবং ভারতের উপকূলের দিকে অগ্রসর হচ্ছে। ভারতের আবহাওয়া বিভাগ ইতিমধ্যে উপকূলীয় অঞ্চলগুলোতে সতর্কতা জারি করেছে।