সামাজিক সংস্কার ও নারী সুরক্ষায় বড়সড় পদক্ষেপ গ্রহণ করল ভারতের আসাম রাজ্য সরকার। বহুবিবাহ বা Polygamy-র মতো সামাজিক ব্যাধিকে চিরতরে নির্মূল করতে বিধানসভায় পেশ করা হলো ‘আসাম বহুবিবাহ নিষিদ্ধকরণ বিল, ২০২৫’ (Assam Prohibition of Polygamy Bill, 2025)। এই বিলে বহুবিবাহকে সরাসরি ‘ফৌজদারি অপরাধ’ বা Criminal Offence হিসেবে গণ্য করার প্রস্তাব রাখা হয়েছে। প্রস্তাবিত আইনটি পাস হলে আসামে প্রথম স্বামী বা স্ত্রী জীবিত থাকা অবস্থায় দ্বিতীয় বিবাহ শুধু নিষিদ্ধই হবে না, বরং এর পরিণাম হবে দীর্ঘমেয়াদী জেল ও জরিমানা।
মঙ্গলবার (২৫ নভেম্বর) বিধানসভার স্পিকার বিশ্বজিৎ দাইমারির অনুমতিক্রমে এই গুরুত্বপূর্ণ বিলটি উত্থাপন করেন রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্বশর্মা। বিলটি আইনে পরিণত হলে রাজ্যের বিচার ব্যবস্থায় এক আমূল পরিবর্তন আসবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
শাস্তির খড়গ: ৭ থেকে ১০ বছরের জেল
প্রস্তাবিত এই আইনে অপরাধের মাত্রা অনুযায়ী শাস্তির বিধান রাখা হয়েছে অত্যন্ত কঠোর। বিলের খসড়া অনুযায়ী, কোনো ব্যক্তি যদি প্রথম স্ত্রী বা স্বামী জীবিত থাকা অবস্থায় দ্বিতীয় বিবাহ করেন, তবে তার সর্বোচ্চ সাত বছরের কারাদণ্ড (Imprisonment) হতে পারে।
তবে অপরাধের মাত্রা আরও গুরুতর হবে যদি কেউ জালিয়াতির আশ্রয় নেন। অর্থাৎ, প্রথম বিয়ের তথ্য গোপন করে (Concealing Information) যদি কেউ দ্বিতীয় বিয়ে করার চেষ্টা করেন বা বিয়ে করেন, সেক্ষেত্রে শাস্তির মেয়াদ বেড়ে দাঁড়াবে ১০ বছর পর্যন্ত। এই কারাদণ্ডের পাশাপাশি মোটা অঙ্কের আর্থিক জরিমানা বা Fine-এর বিধানও রাখা হয়েছে। সরকারের লক্ষ্য পরিষ্কার—আইনের ফাঁকফোকর গলে যেন কোনো অপরাধী পার না পায়।
সহায়তাকারীদেরও রেহাই নেই: কাজি ও পুরোহিতদের দায়বদ্ধতা
এই বিলের অন্যতম উল্লেখযোগ্য দিক হলো এর ব্যাপ্তি। কেবল বর বা কনেই নয়, এই অবৈধ বিয়ে প্রক্রিয়ার সঙ্গে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে জড়িত প্রত্যেককেই আইনের আওতায় আনা হবে। প্রস্তাবিত আইন অনুযায়ী—কাজি, পুরোহিত, ম্যারেজ রেজিস্টার, গ্রামপ্রধান, এমনকি বর-কনের পিতা-মাতা বা আইনি অভিভাবক (Legal Guardian)—যারা জেনেশুনে এই অপরাধমূলক বিবাহে সহায়তা করবেন, তাদের বিরুদ্ধেও সমপরিমাণ শাস্তিমূলক ব্যবস্থা বা Legal Action নেওয়া হবে। অর্থাৎ, বহুবিবাহের আয়োজকদের জন্যও এবার পরিস্থিতি কঠিন হতে চলেছে।
বিরোধী শিবিরের ওয়াকআউট ও আইনের আওতা
মুখ্যমন্ত্রী যখন বিধানসভায় এই বিতর্কিত ও গুরুত্বপূর্ণ বিলটি পেশ করছিলেন, তখন বিরোধী দল কংগ্রেস, সিপিএম এবং রাইজোর বিধায়করা অধিবেশন কক্ষ থেকে ওয়াকআউট (Walkout) করেন। ফলে বিরোধীদের অনুপস্থিতিতেই বিলটি উত্থাপন করা হয়।
বিলের মানবিক দিক হিসেবে ভুক্তভোগী নারীদের জন্য ক্ষতিপূরণ বা Compensation-এর ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে, যা বিচারিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে নিশ্চিত করা হবে। তবে রাজ্যের জনতাত্ত্বিক বৈচিত্র্যের কথা মাথায় রেখে কিছু ছাড়ও দেওয়া হয়েছে। প্রস্তাবিত আইনটি সংবিধানের ষষ্ঠ তফসিলভুক্ত (Sixth Schedule) এলাকা ছাড়া সমগ্র আসামজুড়ে কার্যকর হবে। এছাড়া সংবিধানের ৩৪২ অনুচ্ছেদ (Article 342) অনুযায়ী তফসিলি জাতি ও জনজাতির সদস্যদের এই আইনের আওতা থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে।