টানা দুই বছর ধরে গাজায় চলা রক্তক্ষয়ী সংঘাতের জেরে এক নজিরবিহীন অস্তিত্ব সংকটের মুখে পড়েছে ইসরাইলের প্রতিরক্ষা বাহিনী (IDF)। ফিলিস্তিনের গাজায় গণহত্যা চালিয়ে বিশ্বজুড়ে সমালোচিত এই বাহিনীটি এখন নিজ ঘরের ভেতরেই ‘ইতিহাসের সবচেয়ে বড় জনবল সংকট’ বা ‘Manpower Crisis’-এ ধুঁকছে। ইসরাইলি সংবাদমাধ্যম ‘দৈনিক মারিভ’-এ প্রকাশিত এক বিস্ফোরক নিবন্ধে এই দাবি করেছেন দেশটির অবসরপ্রাপ্ত মেজর জেনারেল ও সামরিক ন্যায়পাল ইতজাক ব্রিক।
তার মতে, যুদ্ধের ময়দানে শারীরিক ও মানসিক বিপর্যয়ের কারণে হাজার হাজার সেনা সদস্য ও অফিসার দায়িত্ব পালনে অস্বীকৃতি জানাচ্ছেন, যা ইসরাইলি সামরিক বাহিনীর মেরুদণ্ড ভেঙে দিচ্ছে।
চুক্তি নবায়নে অনীহা ও গণইস্তফা
দৈনিক মারিভের ওই মতামত কলামে জেনারেল ব্রিক লিখেছেন, সাম্প্রতিক মাসগুলোতে ইসরাইলি সেনাবাহিনীর অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতি চরম আকার ধারণ করেছে। হাজার হাজার অফিসার এবং নন-কমিশনড অফিসার (NCO) হয় নতুন করে সেনা সেবার ডাকে সাড়া দিচ্ছেন না, অথবা তাদের চাকুরির চুক্তি নবায়ন (Contract Renewal) করতে সরাসরি অস্বীকৃতি জানাচ্ছেন।
ব্রিক তার কলামে উল্লেখ করেন, “অনেক অভিজ্ঞ অফিসার তৎক্ষণাৎ অবসর চাইছেন এবং তরুণ বা নতুন রিক্রুটরা দীর্ঘমেয়াদি চুক্তিতে (Long-term Agreement) স্বাক্ষর করতে রাজি হচ্ছেন না। ফলে পুরো বাহিনীজুড়ে এক ভয়াবহ কর্মী সংকট বা ‘Staff Shortage’ তৈরি হয়েছে, যা অতীতে কখনও দেখা যায়নি।”
লুকানো হতাহতের পরিসংখ্যান ও মানসিক বিপর্যয়
ইসরাইলের সামরিক সূত্র ও গণমাধ্যমের তথ্যের বরাত দিয়ে জানা গেছে, ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর থেকে শুরু হওয়া যুদ্ধের গত দুই বছরে গাজায় অন্তত ৯২৩ জন ইসরাইলি সেনা নিহত হয়েছেন। আহত হয়ে হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছেন ৬ হাজার ৩৯৯ জন। তবে এর চেয়েও ভয়াবহ তথ্য হলো সেনাবাহিনীর মানসিক স্বাস্থ্য পরিস্থিতি।
রিপোর্টে বলা হয়েছে, যুদ্ধের ভয়াবহতা দেখে প্রায় ২০ হাজার সেনা সদস্য বর্তমানে ‘পোস্ট-ট্রমাটিক স্ট্রেস ডিসঅর্ডার’ (PTSD) বা যুদ্ধপরবর্তী মানসিক বৈকল্যে ভুগছেন। মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে অনেকেই আর রণক্ষেত্রে ফেরার উপযুক্ত নেই।
অভিযোগ রয়েছে, দেশে জনমনে আতঙ্ক রোধে এবং সেনাদের মনোবল (Morale) ধরে রাখতে ইসরাইল কঠোর ‘সামরিক সেন্সরশিপ’ (Military Censorship) জারি রেখেছে। এর মাধ্যমে প্রকৃত হতাহতের সংখ্যা এবং ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ কমিয়ে দেখানো হচ্ছে।
অচল হওয়ার পথে সামরিক সরঞ্জাম ও সিস্টেম
জনবলের এই আকস্মিক পতন কেবল রণক্ষেত্রেই নয়, বরং সামরিক সরঞ্জাম রক্ষণাবেক্ষণ ও পরিচালনায়ও বিপর্যয় ডেকে এনেছে। জেনারেল ব্রিক সতর্ক করে বলেন, দক্ষ জনবলের অভাবে অত্যাধুনিক সমরাস্ত্র ও যুদ্ধ ব্যবস্থা বা ‘Combat Systems’ রক্ষণাবেক্ষণ (Maintenance) করা সম্ভব হচ্ছে না।
এই জ্যেষ্ঠ সামরিক বিশ্লেষকের ভাষ্যমতে, “এই পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে খুব শিগগিরই ইসরাইলি সেনাবাহিনী ‘সম্পূর্ণ অচল’ বা ‘Non-functional’ অবস্থায় চলে যেতে পারে, যা জাতীয় নিরাপত্তার জন্য এক চূড়ান্ত হুমকি।”
ভুল নীতি ও দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব
ইসরাইলি সেনাবাহিনীর এই নাজুক পরিস্থিতির জন্য সাম্প্রতিক বছরগুলোতে নেওয়া সরকারের ‘ভুল সিদ্ধান্ত’ বা ‘Policy Failure’-কে দায়ী করেছেন ব্রিক। তার মতে, গত কয়েক বছরে ব্যাপক হারে সামরিক কর্মী ছাঁটাই এবং স্বল্পকালীন সেবার মেয়াদ (পুরুষদের জন্য তিন বছর ও নারীদের জন্য দুই বছর) নির্ধারণ করার সিদ্ধান্ত বাহিনীতে বড় ধরনের শূন্যতা (Vacuum) তৈরি করেছে। এখন যুদ্ধের ময়দানে সেই শূন্যতা পূরণ করা অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছে।
গাজায় ধ্বংসযজ্ঞের পরিসংখ্যান
অন্যদিকে, ইসরাইলি বাহিনী যখন নিজেদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে হিমশিম খাচ্ছে, তখন গাজায় তাদের চালানো ধ্বংসযজ্ঞের পরিসংখ্যানও শিউরে ওঠার মতো। ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে চলা এই গণহত্যায় এখন পর্যন্ত ৭০ হাজারের বেশি ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন, যাদের মধ্যে অধিকাংশই নারী ও শিশু। আন্তর্জাতিক চাপ ও নিজেদের অভ্যন্তরীণ সংকট—উভয় দিক থেকেই এখন কোণঠাসা তেল আবিব।