দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বিস্তীর্ণ অঞ্চলে প্রকৃতির রুদ্ররোষ যেন থামছেই না। মালাক্কা প্রণালিতে সৃষ্ট এক বিরল গ্রীষ্মমণ্ডলীয় ঝড় (Rare Tropical Storm) এবং সপ্তাহব্যাপী টানা বর্ষণে ইন্দোনেশিয়া, থাইল্যান্ড ও মালয়েশিয়ায় বন্যা পরিস্থিতি ভয়াবহ রূপ ধারণ করেছে। রোববার (৩০ নভেম্বর) সরকারি কর্মকর্তারা নিশ্চিত করেছেন, এই তিন দেশে সৃষ্ট বন্যা ও ভয়াবহ ভূমিধসে (Landslide) মৃতের সংখ্যা ৬০০ ছাড়িয়ে গেছে।
উদ্ধারকর্মীরা বিরামহীনভাবে ‘রেসকিউ অপারেশন’ (Rescue Operation) চালিয়ে গেলেও দুর্গম এলাকাগুলোতে পৌঁছানো চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এরই মধ্যে কয়েক লাখ মানুষকে নিরাপদ আশ্রয়ে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে, তবুও গৃহহীন হয়ে পড়েছেন লাখ লাখ মানুষ।
মৃত্যুপুরীতে পরিণত তিন দেশ, ক্ষতিগ্রস্ত ৪০ লাখ
সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, এই প্রলয়ংকরী দুর্যোগে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার তিনটি দেশে মোট ৪০ লাখের বেশি মানুষ সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। এর মধ্যে থাইল্যান্ডের দক্ষিণাঞ্চলে প্রায় ৩০ লাখ এবং ইন্দোনেশিয়ার পশ্চিমাঞ্চলে ১১ লাখ মানুষ পানিবন্দি বা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন।
মৃতের সংখ্যার দিক থেকে সবচেয়ে নাজুক পরিস্থিতি ইন্দোনেশিয়ায়। দেশটিতে বন্যা ও ভূমিধসে অন্তত ৪৩৫ জন প্রাণ হারিয়েছেন। থাইল্যান্ডে মৃতের সংখ্যা ১৭০ এবং মালয়েশিয়ায় এখন পর্যন্ত তিনজনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। যদিও অনেক এলাকা থেকে পানি নামতে শুরু করেছে, তবুও ধ্বংসযজ্ঞের চিহ্ন সর্বত্র ছড়িয়ে আছে।
শ্রীলঙ্কায় ঘূর্ণিঝড়ের আঘাত: নিখোঁজ দুই শতাধিক
দুর্যোগের কালো ছায়া কেবল দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় নয়, ছড়িয়ে পড়েছে বঙ্গোপসাগরের অপর প্রান্তে অবস্থিত দ্বীপরাষ্ট্র শ্রীলঙ্কাতেও। শ্রীলঙ্কান কর্তৃপক্ষের তথ্যমতে, ঘূর্ণিঝড়ের আঘাতে সেখানে আরও ১৫৩ জনের মৃত্যু হয়েছে। পরিস্থিতি এতটাই উদ্বেগজনক যে, এখনও ১৯১ জন নিখোঁজ রয়েছেন। দেশজুড়ে প্রায় পাঁচ লাখ মানুষ এই প্রাকৃতিক বিপর্যয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন, যা দেশটিতে একটি বড় ধরনের মানবিক সংকটের (Humanitarian Crisis) জন্ম দিয়েছে।
সুমাত্রায় বিচ্ছিন্ন যোগাযোগ ব্যবস্থা ও লুটপাটের শঙ্কা
ইন্দোনেশিয়ার সুমাত্রা দ্বীপের আচেহ, নর্থ সুমাত্রা ও ওয়েস্ট সুমাত্রা প্রদেশ দুর্যোগের সবচেয়ে বড় শিকার হয়েছে। ঘূর্ণিঝড় ‘সেনিয়া’-র প্রভাবে পাহাড়ধসের ঘটনায় বহু মানুষ এখনও মাটির নিচে চাপা পড়ে আছেন বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
সেন্ট্রাল তাপানুলি ও সিবোলগা অঞ্চলের সড়ক যোগাযোগ বা ‘রোড কানেক্টিভিটি’ (Road Connectivity) সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ায় স্থলপথে ত্রাণ পাঠানো অসম্ভব হয়ে পড়েছে। এমতাবস্থায় সমুদ্রপথ ব্যবহার করে ত্রাণ পৌঁছানোর জরুরি প্রস্তুতি নিচ্ছে প্রশাসন।
এদিকে দুর্গত গ্রামগুলোতে দেখা দিয়েছে নতুন সংকট। পানি নেমে গেলেও কাদা ও ধ্বংসস্তূপের কারণে যোগাযোগ ব্যবস্থা স্বাভাবিক হয়নি। এর মধ্যেই ঘরবাড়ি ছেড়ে আশ্রয়কেন্দ্রে যাওয়া মানুষদের মধ্যে কাজ করছে চরম নিরাপত্তা হীনতা। সুমাত্রার বেশ কিছু এলাকায় দোকানপাট ও পরিত্যক্ত ঘরবাড়িতে চুরির ঘটনা ঘটেছে। পুলিশের ধারণা, দুর্গম এলাকায় ত্রাণ বা ‘রিলিফ ম্যাটেরিয়াল’ (Relief Material) সময়মতো না পৌঁছানোর ফলে সৃষ্ট হাহাকার থেকে কেউ কেউ লুটপাটে জড়িয়ে পড়ছেন।
ফিলিপাইনে দুর্নীতির অভিযোগে গণবিক্ষোভ
প্রাকৃতিক দুর্যোগের পাশাপাশি ফিলিপাইনে শুরু হয়েছে তীব্র রাজনৈতিক অস্থিরতা। সাম্প্রতিক ভয়াবহ বন্যায় বহু মানুষের প্রাণহানির পর দেশটির বন্যা প্রতিরোধ খাতের ‘করাপশন’ (Corruption) বা দুর্নীতি নিয়ে জনমনে ক্ষোভ বিস্ফোরিত হয়েছে।
অভিযোগ উঠেছে, বন্যা মোকাবিলার জন্য বরাদ্দকৃত কোটি কোটি ডলারের তহবিল বা ‘ফান্ড’ (Fund) আত্মসাৎ করা হয়েছে। এই দুর্নীতির প্রতিবাদে রোববার রাজধানী ম্যানিলার রাজপথে নেমে আসেন হাজার হাজার সাধারণ শিক্ষার্থী ও বামপন্থী রাজনৈতিক কর্মীরা। বিক্ষোভকারীরা অবিলম্বে প্রেসিডেন্ট বংবং মার্কোস জুনিয়রের পদত্যাগ দাবি করছেন। তাদের অভিযোগ, সরকারি অব্যবস্থাপনা ও দুর্নীতির কারণেই বন্যায় জানমালের এত ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে।