রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) প্লট বরাদ্দ সংক্রান্ত দুর্নীতির মামলায় ব্রিটিশ পার্লামেন্টের সদস্য (British MP) টিউলিপ রিজওয়ানা সিদ্দিকীকে দুই বছরের কারাদণ্ডাদেশ দিয়েছেন বাংলাদেশের একটি আদালত। এই রায়ের মাধ্যমে বাংলাদেশের বিচারিক ইতিহাসে প্রথম কোনো কর্মরত ব্রিটিশ এমপি-কে সাজা দেওয়া হলো।
সোমবার (১ ডিসেম্বর) দুপুর পৌনে ১২টার দিকে ঢাকার বিশেষ জজ আদালত-৪ এর বিজ্ঞ বিচারক মো. রবিউল আলমের আদালত এই রায় ঘোষণা করেন। একই মামলায় টিউলিপ সিদ্দিকীর মা শেখ রেহানাকে সাত বছরের এবং সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ আরও ১৫ জন আসামিকে পাঁচ বছর করে কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। প্রত্যেক আসামিকে এক লাখ টাকা অর্থদণ্ড, অনাদায়ে ছয় মাসের বিনাশ্রম কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে।
আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে প্রধান শিরোনাম
ঢাকার আদালতে টিউলিপ সিদ্দিকীর কারাদণ্ড ঘোষণার পরপরই খবরটি আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে দ্রুততার সঙ্গে ছড়িয়ে পড়ে। বিবিসি (BBC), স্কাই নিউজ (Sky News), রয়টার্স (Reuters), দ্য ইন্ডিপেন্ডেন্ট (The Independent) সহ বিশ্বের প্রথম সারির সংবাদমাধ্যমগুলোর অনলাইন ভার্সনের (Online Version) প্রথম পাতায় এই খবর গুরুত্বের সঙ্গে স্থান পেয়েছে।
গণমাধ্যমগুলো ভিন্ন ভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে রায়ের ওপর আলোকপাত করেছে:
বিবিসি শিরোনাম করেছে, ‘টিউলিপ সিদ্দিকের অনুপস্থিতিতে বিচার, বাংলাদেশে আদালতের কারাদণ্ড’।
রয়টার্স (Reuters) শিরোনাম করেছে, ‘দুর্নীতি মামলায় ব্রিটিশ এমপি টিউলিপ সিদ্দিকের দুই বছরের কারাদণ্ড’।
আইনি জটিলতা ও দণ্ড কার্যকর হওয়ার প্রশ্ন
টিউলিপ সিদ্দিকীর দণ্ডাদেশ আন্তর্জাতিক মহলে বিশেষ করে যুক্তরাজ্যে একাধিক আইনি প্রশ্ন তুলেছে। এই সংক্রান্ত জটিলতার বিষয়টিই আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলোর আলোচনার কেন্দ্রে রয়েছে।
নাগরিকত্বের বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন: বিবিসির এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, টিউলিপ সিদ্দিকীর আইনজীবীরা তার বাংলাদেশি নাগরিকত্ব নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। আইনজীবীরা ফিনান্সিয়াল টাইমস (Financial Times) পত্রিকাকে জানিয়েছেন, টিউলিপ সিদ্দিকীর কখনোই কোনো বাংলাদেশি পরিচয়পত্র বা ভোটার আইডি ছিল না এবং তিনি ছোটবেলা থেকেই কোনো বাংলাদেশি পাসপোর্ট ব্যবহার করেননি। এ অবস্থায় তার অনুপস্থিতিতে বাংলাদেশের আদালতে এই বিচারের গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে বিতর্ক তৈরি হয়েছে।
প্রত্যর্পণ চুক্তি (Extradition Treaty) সংক্রান্ত ধোঁয়াশা: অন্যদিকে, রয়টার্স (Reuters) তাদের প্রতিবেদনে রায়ের বর্ণনা দিয়ে গুরুত্বের সঙ্গে জানিয়েছে, ব্রিটেন এবং বাংলাদেশের মধ্যে বর্তমানে কোনো প্রত্যর্পণ চুক্তি কার্যকর নেই। এর সরাসরি অর্থ হলো, বাংলাদেশের আদালত এই রায় দিলেও তা যুক্তরাজ্যে অবস্থানরত টিউলিপ সিদ্দিকীর ক্ষেত্রে তাৎক্ষণিকভাবে কার্যকর (Enforceable) করা নিয়ে গভীর ধোঁয়াশা ও অনিশ্চয়তা রয়ে গেল।
প্লট দুর্নীতি মামলার পূর্ণাঙ্গ চিত্র
দুদকের এই মামলায় অভিযোগ ছিল, সরকারের সর্বোচ্চ পদে থাকার সুবাদে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও তার পরিবারের সদস্যরা ক্ষমতার অপব্যবহার করে অবৈধভাবে রাজউকের পূর্বাচল নতুন শহর প্রকল্পে প্লট বরাদ্দ নিয়েছেন।
পাঁচ বছর করে কারাদণ্ডপ্রাপ্ত অন্য আসামিরা হলেন: জাতীয় গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের প্রশাসনিক কর্মকর্তা মো. সাইফুল ইসলাম সরকার, সিনিয়র সহকারী সচিব পূরবী গোলদার, অতিরিক্ত সচিব অলিউল্লাহ, সচিব কাজী ওয়াছি উদ্দিন, রাজউকের সাবেক চেয়ারম্যানের পিএ মো. আনিছুর রহমান মিঞা, সাবেক সদস্য মোহাম্মদ খুরশীদ আলম, তন্ময় দাস, মোহাম্মদ নাসির উদ্দীন, মেজর (ইঞ্জি.) সামসুদ্দীন আহমদ চৌধুরী (অব.), সাবেক পরিচালক মো. নুরুল ইসলাম, সহকারী পরিচালক মাজহারুল ইসলাম, উপপরিচালক নায়েব আলী শরীফ, সাবেক প্রধানমন্ত্রীর একান্ত সচিব-১ মোহাম্মদ সালাহ উদ্দিন এবং সাবেক গৃহায়ন ও গণপূর্ত প্রতিমন্ত্রী শরীফ আহমেদ।
উল্লিখিত আসামিদের মধ্যে মোহাম্মদ খুরশীদ আলম কারাগারে আটক রয়েছেন। পলাতক থাকা বাকি আসামিদের বিরুদ্ধে আদালত গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেছেন। উল্লেখ্য, এই মামলার রায়ের পূর্বে প্লট দুর্নীতির আরও তিনটি মামলায় শেখ হাসিনার মোট ২১ বছরের কারাদণ্ডাদেশ হয়েছিল।