বয়স ৪০-এর কোঠায়, তবু মাঠের সবুজে তিনি যেন চিরতরুণ। ক্ষিপ্র গতি আর অদম্য গোলক্ষুধা নিয়ে ছুটছেন ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো। কিন্তু প্রকৃতির নিয়মেই ক্যারিয়ারের গোধূলিলগ্নে দাঁড়িয়ে ভাবতে হচ্ছে ‘তারপর কী?’। বুট জোড়া তুলে রাখার পর এই মহাতারকা কি ডাগআউটে কোচ হিসেবে দাঁড়াবেন, নাকি পুরোদস্তুর ব্যবসায়ী হিসেবে আত্মপ্রকাশ করবেন? জল্পনা-কল্পনার অবসান ঘটিয়ে সিআর সেভেন নিজেই দিলেন বড় ইঙ্গিত। ফুটবলের ময়দান ছাড়লেও প্রতিযোগিতার ঝাঁজ কমছে না তাঁর জীবনে; বরং তিনি নাম লেখাতে চলেছেন ‘মিক্সড মার্শাল আর্ট’ (MMA) বা কমব্যাট স্পোর্টসের রোমাঞ্চকর দুনিয়ায়। তবে ফাইটার হিসেবে নয়, বরং গেম চেঞ্জার বা ‘বিজনেস পার্টনার’ হিসেবে।
অবসরের গুঞ্জন এবং পরবর্তী পরিকল্পনা
আগামী বছরই হয়তো ক্যারিয়ারের শেষ বিশ্বকাপটি খেলতে যাচ্ছেন পর্তুগিজ সুপারস্টার। গত মাসেই সিএনএন-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে নিজের অবসরের সময়সীমা নিয়ে খোলামেলা আলোচনা করেছেন তিনি। রোনালদো স্পষ্ট করেছিলেন, খুব শিগগিরই তিনি ফুটবলকে বিদায় জানাবেন। এই ‘শিগগিরই’ বলতে তিনি আগামী এক থেকে দুই বছরের সময়কালকে নির্দেশ করেছেন। মাঠের খেলা ছাড়ার পর তিনি নিজেকে কোথায় দেখতে চান, তা নিয়ে ভক্তদের কৌতূহলের শেষ নেই। সেই কৌতূহলের আগুনে ঘি ঢেলে রোনালদো বেছে নিলেন এমন এক জগত, যা শক্তি, সাহস এবং কৌশলের প্রতীক।
রোনালদোর ব্যবসায়িক সাম্রাজ্য ও এমএমএ কানেকশন
ফুটবল মাঠের বাইরে রোনালদো একজন সফল ‘বিজনেস ম্যাগনেট’। হোটেল চেইন, জিমনেসিয়াম, প্রিমিয়াম ফ্যাশন ব্র্যান্ড, পারফিউম থেকে শুরু করে প্রযুক্তি এবং স্বাস্থ্যখাতে তাঁর বিশাল বিনিয়োগ রয়েছে। কিন্তু এবারের বিনিয়োগটি সম্পূর্ণ ভিন্নধর্মী। একজন অ্যাথলেট হিসেবে স্পোর্টসের প্রতি তাঁর আজন্ম টান। সেই টান থেকেই সম্ভবত তিনি যুক্ত হচ্ছেন ‘মিক্সড মার্শাল আর্ট’-এর মতো দ্রুত বর্ধনশীল গ্লোবাল স্পোর্টসের সঙ্গে।
সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ‘এক্স’ (সাবেক টুইটার)-এ নিজের ভেরিফায়েড হ্যান্ডেল থেকে একটি পোস্টে রোনালদো এই নতুন অধ্যায়ের ঘোষণা দেন। তিনি লেখেন, “অত্যন্ত রোমাঞ্চের সঙ্গে জানাচ্ছি, আমি ওয়াওএফসি (WOWFC)-এর পার্টনার বা অংশীদার হতে যাচ্ছি। শৃঙ্খলা, সম্মান এবং দৃঢ়তার মতো মূল্যবোধগুলো আমাদের এক সুতোয় গেঁথেছে। ওয়াওএফসি অনন্য এবং শক্তিশালী কিছু তৈরি করছে, আর এই যাত্রায় যোগ দিতে পেরে আমি গর্বিত। আমাদের লক্ষ্য খেলাটাকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাওয়া এবং তরুণ প্রজন্মকে অনুপ্রাণিত করা।”
‘ওয়াওএফসি’ এবং নতুন যুগের সূচনা
‘ওয়াওএফসি’-র পূর্ণ রূপ হলো ‘ওয়ে অব ওয়ারিয়র’ (Way of Warrior)। এটি একটি স্প্যানিশ এমএমএ ইভেন্ট অর্গানাইজেশন, যা বিশ্বজুড়ে কমব্যাট স্পোর্টস ইভেন্ট আয়োজন করে থাকে। রোনালদোর এই পোস্টে সংযুক্ত একটি প্রেস রিলিজ বা সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, “ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো ওয়াওএফসি-র অংশীদার হয়ে বিশ্বব্যাপী এক নতুন যুগের সূচনা করলেন। বিশ্বের অন্যতম প্রভাবশালী ও জনপ্রিয় অ্যাথলেটের এই অন্তর্ভুক্তি ওয়াওএফসি এবং ভবিষ্যতের মিক্সড মার্শাল আর্ট দুনিয়ার জন্য একটি ‘টার্নিং পয়েন্ট’।”
যুক্তরাজ্যের সংবাদমাধ্যম ‘ম্যানচেস্টার ইভিনিং নিউজ’-এর তথ্যমতে, এই প্রতিষ্ঠানের বোর্ডে রোনালদো একা নন, তাঁর সঙ্গে যোগ দিচ্ছেন ইউএফসি (UFC) লাইটওয়েট চ্যাম্পিয়ন এবং তারকা ফাইটার ইলিয়া তপুরিয়া (Ilia Topuria)। ফুটবলের গ্ল্যামার এবং এমএমএ-র শক্তির এই মেলবন্ধন স্পোর্টস বিজনেসে বড় ধরনের আলোড়ন তুলবে বলে ধারণা করছেন বিশ্লেষকরা।
মার্কেট ভ্যালু ও প্রবৃদ্ধির পরিসংখ্যান
ব্যবসায়ী রোনালদো যে হুট করে কোনো সিদ্ধান্ত নেন না, তা ওয়াওএফসি-র সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান দেখলেই বোঝা যায়। প্রতিষ্ঠানটির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, বিগত বছরগুলোতে তাদের ইভেন্টে অংশগ্রহণের হার প্রায় ৪০০ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। প্রতিটি শো-তে টিকিট বিক্রির সংখ্যা ধারাবাহিকভাবে ৫ হাজারের গণ্ডি পার করছে। বর্তমানে বিশ্বের ১৭০টিরও বেশি দেশে তাদের ইভেন্টগুলো সম্প্রচারিত হচ্ছে, যা এই প্রতিষ্ঠানকে কমব্যাট স্পোর্টস ইন্ডাস্ট্রিতে একটি উদীয়মান শক্তিতে পরিণত করেছে।
গত রোববার (৩০ নভেম্বর) রোনালদো তাঁর ‘এক্স’ হ্যান্ডেলে ইলিয়া তপুরিয়ার সঙ্গে একটি ভিডিও শেয়ার করেন, যার ক্যাপশনে লেখা ছিল— ‘লড়াইয়ের (ফাইটিং) নতুন যুগ শুরু হচ্ছে।’ ভিডিওতে দুই তারকা নিজেদের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা ও ইচ্ছার কথা তুলে ধরেন। ফুটবলের রাজা যখন ফাইটিংয়ের রিংয়ে বিনিয়োগ করেন, তখন সেই খেলা যে ‘গ্লোবাল ফেনোমেনন’-এ রূপ নেবে, তা বলাই বাহুল্য।