ইউক্রেন যুদ্ধের অবসান ঘটাতে কূটনৈতিক তৎপরতা যখন তুঙ্গে, ঠিক তখনই নিজের চূড়ান্ত অবস্থান পরিষ্কার করলেন ভলোদিমির জেলেনস্কি। শান্তি আলোচনার টেবিলে বসতে রাজি থাকলেও, মাতৃভূমির এক ইঞ্চি মাটিও ছাড় দিতে নারাজ তিনি। ইউক্রেনের প্রেসিডেন্টের মতে, চলমান শান্তি প্রক্রিয়ায় ‘টেরিটোরিয়াল ইন্টিগ্রিটি’ বা ভূখণ্ডগত অখণ্ডতার ইস্যুটিই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। প্যারিসে ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁর সঙ্গে এক হাই-প্রোফাইল বৈঠকের পর জেলেনস্কি সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, দখলকৃত কোনো এলাকাই কিয়েভ হাতছাড়া করবে না।
এদিকে, শান্তির আলোচনার সমান্তরালে রণাঙ্গনেও চলছে রাশিয়ার আগ্রাসন। সোমবার (১ ডিসেম্বর) ইউক্রেনের দিনিপ্রো শহরে রুশ মিসাইল হামলায় অন্তত চারজন নিহত হয়েছেন, ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে একটি বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস। অন্যদিকে, যুদ্ধবিরতির জটিল সমীকরণ মেলাতে শিগগিরই মস্কো সফরে যাচ্ছেন মার্কিন বিশেষ দূত।
দিনিপ্রোতে ‘মিসাইল স্ট্রাইক’ ও ধ্বংসযজ্ঞ
কূটনৈতিক টেবিলের আলোচনা যখন চলছে, তখন পূর্ব ও মধ্য ইউক্রেনের দিনিপ্রো শহর কেঁপে ওঠে ভয়াবহ বিস্ফোরণে। সোমবার স্থানীয় সময়ে পরিচালিত এই রুশ বিমান হামলায় একটি বিশ্ববিদ্যালয় ভবন এবং একটি কিন্ডারগার্টেন ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। হামলার তীব্রতায় উড়ে যায় ভবনের জানালা, ধসে পড়ে ছাদ। ঘটনাস্থল থেকে পাওয়া তথ্যে জানা গেছে, হামলায় অন্তত চারজন প্রাণ হারিয়েছেন এবং আহত হয়েছেন আরও বেশ কয়েকজন। স্থানীয় কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, আহতদের অনেকের অবস্থা আশঙ্কাজনক, ফলে নিহতের সংখ্যা বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে। হামলার লক্ষ্যবস্তু হিসেবে বেছে নেওয়া হয়েছিল বেসামরিক স্থাপনা, যা যুদ্ধের ভয়াবহতাকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।
প্যারিস বৈঠক ও ‘সিকিউরিটি গ্যারান্টি’র দাবি
সোমবার প্যারিসে ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁর সঙ্গে রুদ্ধদ্বার বৈঠক করেন জেলেনস্কি। এই বৈঠকে তিনি যুক্তরাজ্য, জার্মানি, পোল্যান্ড ও ইতালির মতো ইউরোপীয় পরাশক্তির নেতাদের সঙ্গেও কনফারেন্স কলে যুক্ত হন। বৈঠকের মূল এজেন্ডা ছিল যুদ্ধ পরবর্তী ইউক্রেনের নিরাপত্তা।
যৌথ সংবাদ সম্মেলনে জেলেনস্কি বলেন, “শান্তি আলোচনায় সবচেয়ে বড় এবং জটিল চ্যালেঞ্জ হচ্ছে ভূখণ্ড ইস্যু। কিয়েভ কোনোভাবেই দখলকৃত এলাকা ছাড় দেবে না।” তিনি আরও যোগ করেন, “রাশিয়ান ফেডারেশন যাতে ভবিষ্যতে তৃতীয় কোনো আক্রমণ (Third Party Attack) চালাতে না পারে এবং শান্তি চুক্তির শর্ত ভঙ্গ না করে, তার জন্য আমরা কাজ করছি। ইতিহাস সাক্ষী, রাশিয়া বহুবার প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করেছে। তাই আমাদের মৌখিক আশ্বাস নয়, বরং নিরেট এবং নির্ভরযোগ্য ‘সিকিউরিটি গ্যারান্টি’ প্রয়োজন।”
ইউরোপীয় নেতারাও জেলেনস্কির এই অবস্থানের প্রতি সমর্থন জানিয়েছেন। তাঁদের মতে, ইউক্রেনের সীমান্ত নির্ধারণের অধিকার একমাত্র কিয়েভের হাতেই থাকা উচিত এবং এ নিয়ে কোনো আপস সম্ভব নয়।
মস্কো মিশনে মার্কিন দূত: ট্রাম্প প্রশাসনের ছায়া?
যুদ্ধ অবসানে ওয়াশিংটনের তৎপরতাও চোখে পড়ার মতো। হোয়াইট হাউস সূত্রে জানা গেছে, ফ্লোরিডায় মার্কিন ও ইউক্রেনীয় প্রতিনিধিদের মধ্যে অনুষ্ঠিত সাম্প্রতিক বৈঠকটি ছিল অত্যন্ত ‘ফলপ্রসূ’। তবে সবচেয়ে বড় চমক হিসেবে দেখা হচ্ছে আসন্ন মস্কো সফরকে। খুব শিগগিরই রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সঙ্গে বৈঠকে বসতে যাচ্ছেন মার্কিন বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ এবং ডোনাল্ড ট্রাম্পের জামাতা ও সাবেক উপদেষ্টা জ্যারেড কুশনার।
আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের যৌথ আলোচনার ভিত্তিতে তৈরি করা একটি নতুন ‘নিরাপত্তা নকশা’ বা ব্লু-প্রিন্ট পুতিনের সামনে তুলে ধরবেন তাঁরা। এই বৈঠকে যুদ্ধের মোড় ঘোরানোর মতো সিদ্ধান্ত আসতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
রণাঙ্গনের দাবি ও পাল্টা দাবি
কূটনীতির পাশাপাশি মাঠের লড়াইয়েও দুপক্ষ অনড়। ক্রেমলিন দাবি করেছে, তাদের সেনাবাহিনী কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ পোকরোভস্ক ও ভভচানস্ক এলাকা দখল করে নিয়েছে। যদিও কিয়েভ এই দাবি সরাসরি নাকচ করে দিয়েছে। অন্যদিকে, কৃষ্ণ সাগরে বাণিজ্যিক জাহাজের নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে তুরস্ক। আঙ্কারা সতর্ক করে বলেছে, বাণিজ্যিক জাহাজে হামলা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয় এবং এ ধরনের কর্মকাণ্ড বৈশ্বিক ‘মেরিটাইম সিকিউরিটি’ বা সামুদ্রিক নিরাপত্তাকে চরম ঝুঁকির মুখে ফেলছে।