ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগে মাঝেমধ্যেই এমন কিছু ম্যাচের জন্ম হয়, যা ফুটবল রোমান্টিকদের স্মৃতিতে স্থায়ী হয়ে রয়। মঙ্গলবার (২ ডিসেম্বর) রাতে ক্রাভেন কটেজে এমনই এক ‘হাই-ভোল্টেজ’ নাটকের সাক্ষী হলো ফুটবল বিশ্ব। ম্যানচেস্টার সিটি ও ফুলহ্যামের মধ্যকার লড়াইটি কেবল একটি ফুটবল ম্যাচ ছিল না, ছিল স্নায়ুক্ষয়ী এক রোলারকোস্টার রাইড। আর্লিং হলান্ডের রেকর্ডগড়া গোল, ফিল ফোডেনের ম্যাজিক এবং ফুলহ্যামের অবিশ্বাস্য প্রত্যাবর্তনের গল্পে ঠাসা এই ম্যাচে শেষ পর্যন্ত ৫-৪ গোলের শ্বাসরুদ্ধকর জয় নিয়ে মাঠ ছেড়েছে পেপ গার্দিওলার শিষ্যরা।
প্রথমার্ধের দাপট এবং দ্বিতীয়ার্ধের শুরুতে বড় ব্যবধানে এগিয়ে যাওয়ার পর মনে হচ্ছিল জয়টা কেবল সময়ের অপেক্ষা। কিন্তু ‘মৃতপ্রায়’ ম্যাচকে জীবন্ত করে তুলে ম্যানসিটির রক্ষণভাগকে কাঁপিয়ে দিয়েছিল স্বাগতিক ফুলহ্যাম। শেষ পর্যন্ত রক্ষণ সামলে পূর্ণ ৩ পয়েন্ট নিয়ে ‘টাইটেল রেস’-এ আর্সেনালের ঘাড়ে নিশ্বাস ফেলছে বর্তমান চ্যাম্পিয়নরা।
হলান্ডের ঐতিহাসিক ‘সেঞ্চুরি’ ও সিটির দাপট
ম্যাচের শুরু থেকেই আক্রমণাত্মক ফুটবলের পসরা সাজিয়ে বসে সিটিজেনরা। সবার চোখ ছিল আর্লিং হলান্ডের দিকে, একটি গোলের অপেক্ষায় ছিলেন রেকর্ডের পাতায় নাম লেখাতে। সেই অপেক্ষা ফুরোতে সময় লাগেনি। খেলার ১৭ মিনিটে জেরেমি ডোকুর বাড়ানো পাস পেনাল্টি স্পটে রিসিভ করে চোখের পলকে জালে জড়ান এই নরওয়েজিয়ান স্ট্রাইকার। এই গোলের মাধ্যমেই তিনি প্রিমিয়ার লিগে নিজের ১০০তম গোলের ‘মাইলফলক’ (Milestone) স্পর্শ করেন।
মাত্র ১১১ ম্যাচ খেলে ১০০ গোলের এই ল্যান্ডমার্ক ছুঁয়ে হলান্ড ভেঙে দিলেন ইংলিশ কিংবদন্তি অ্যালান শিয়েরারের দীর্ঘদিনের রেকর্ড। শিয়েরারের লেগেছিল ১২৪ ম্যাচ। সিটির দ্বিতীয় গোলটিতেও ছিল হলান্ডের অবদান। তার অসাধারণ ‘থ্রু পাস’ থেকে বল পেয়ে ডাচ মিডফিল্ডার তিজান্নি রেইন্ডার্স এক দুর্দান্ত চিপে গোলরক্ষককে পরাস্ত করেন। বিরতির ঠিক আগে ৪৪ মিনিটে বক্সের বাইরে থেকে ফিল ফোডেনের বুলেট গতির শট সিটিকে ৩-০ ব্যবধানে এগিয়ে দেয়। তবে প্রথমার্ধের ইনজুরি টাইমে এমিল স্মিথ রো এক গোল শোধ করে ফুলহ্যামকে ম্যাচে রাখার ইঙ্গিত দেন।
৫-১ থেকে ৫-৪: ক্রাভেন কটেজে নাটকের চূড়ান্ত পর্ব
দ্বিতীয়ার্ধের শুরুটা হয়েছিল সিটির দাপটেই। খেলা শুরুর কিছুক্ষণের মধ্যেই ফিল ফোডেন তার দ্বিতীয় গোলটি করেন। সতীর্থের পাসে ব্যাক হিলের জাদুকরী ছোঁয়ায় স্কোরলাইন ৪-১ করেন এই ইংলিশ ফরোয়ার্ড। ৫৪ মিনিটে জেরেমি ডোকুর শট ফুলহ্যামের সান্ডার বার্জের গায়ে লেগে জালে জড়ালে সিটি ৫-১ ব্যবধানে এগিয়ে যায়। মনে হচ্ছিল, ম্যাচ ওখানেই শেষ।
কিন্তু প্রিমিয়ার লিগের সৌন্দর্যই হলো এর অনিশ্চয়তা। ৫-১ ব্যবধানে পিছিয়ে পড়ার পর ফুলহ্যাম যেন নতুন করে জেগে ওঠে। ৫৭ মিনিটে অ্যালেক্স আইয়োবি গোল করে ব্যবধান কমান। এরপর শুরু হয় সামুয়েল চুকওয়েজের একক শো। ৭২ ও ৭৮ মিনিটে দ্রুত দুই গোল করে তিনি ম্যাচটিকে ৫-৪ অবস্থায় নিয়ে আসেন। শেষ ১০ মিনিট ছিল ম্যানসিটির জন্য এক কঠিন পরীক্ষা বা ‘Survival Test’। ফুলহ্যামের একের পর এক আক্রমণ সামলে শেষ পর্যন্ত ৩ পয়েন্ট নিশ্চিত করেই মাঠ ছাড়ে চ্যাম্পিয়নরা।
পয়েন্ট টেবিলের সমীকরণ
এই রোমাঞ্চকর জয়ের ফলে প্রিমিয়ার লিগের শিরোপা লড়াই আরও জমে উঠল। ১৪ ম্যাচ শেষে ৯ জয় ও ১ ড্রয়ে ২৮ পয়েন্ট নিয়ে টেবিলের দ্বিতীয় স্থানে অবস্থান করছে ম্যানচেস্টার সিটি। এক ম্যাচ কম খেলে ৩০ পয়েন্ট নিয়ে শীর্ষে আছে আর্সেনাল। অন্যদিকে, ১৪ ম্যাচে ১৭ পয়েন্ট নিয়ে রেলিগেশন অঞ্চলের কাছাকাছি ১৫ নম্বরে রয়েছে লড়াকু ফুলহ্যাম। সিটিজেনদের এই জয় আর্সেনালের ওপর চাপ বাড়াবে, তা নিশ্চিতভাবেই বলা যায়।