মূল বাহিনী পাকঘাঁটিগুলো পাশ কাটিয়ে যেতে লাগল। এই রণকৌশল পাকবাহিনী ধরতে পারেনি। ১৯৭১ সালের ৪ ডিসেম্বরের পরিস্থিতির এ চিত্র উঠে আসে মুজিবনগর সরকারের কর্মকর্তা লেখক প্রয়াত রবীন্দ্রনাথ ত্রিবেদীর বর্ণনায়। মূলত আগের দিন (৩ ডিসেম্বর) পাকিস্তানের যুদ্ধবিমান ভারতের কয়েকটি বিমানঘাঁটিতে বোমাবর্ষণ করলে ভারত পাকিস্তানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে।
এক দিনের ব্যবধানেই বাংলাদেশ ও ভারতের যৌথ আক্রমণে অনেক অঞ্চলে পিছু হটতে শুরু করে পাকিস্তানি বাহিনী। কবি সুফিয়া কামাল তাঁর দিনলিপিমূলক গ্রন্থ ‘একাত্তরের ডায়েরী’তে ৪ ডিসেম্বরের উত্তেজনা ও উৎকণ্ঠার চিত্র তুলে ধরেন। তিনি লেখেন, ‘কাল রাত পৌনে ৩টায় প্রথম বিমান আক্রমণ শুরু হলো। মুক্তিবাহিনীরই হোক কিংবা ভারতীয়ই হোক, ঢাকার বুকে বিমান আক্রমণ এত দিনে পৌঁছে গেল।
লোকজনের মৃত্যু বা তেমন কোনো ক্ষয়ক্ষতির কথা শোনা গেল না। কিন্তু আতঙ্ক উৎকণ্ঠায় লোকজন অস্থির। কত সর্বনাশের পর এ উৎকণ্ঠা আবার কত দিন ধরে চলবে কে জানে। দিনের পর দিন জীবন থেকে মুছে যাচ্ছে। মন-জীবন-দিনক্ষণ বিরস বিবর্ণ বিস্বাদ। ’ লেখক ও গবেষক মঈদুল হাসান মূলধারা ’৭১ বইয়ে লেখেন, ‘৪ঠা ডিসেম্বরে পূর্বাঞ্চলে ভারতীয় ও বাংলাদেশ বাহিনীর মিলিত প্রত্যাঘাত শুরু হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে অধিকৃত এলাকার সর্বত্র একযোগে মুক্তিযোদ্ধা ও নির্যাতিত সাধারণ মানুষ পাকিস্তানি অবস্থানের বিরুদ্ধে সমুত্থিত হয়। এর ফলে মুক্তি অভিযান যে অসামান্য গতিবেগ অর্জন করে, তা পাকিস্তানের আশঙ্কা ও ভারতের প্রত্যাশা উভয়কেই ছাড়িয়ে যায়।’
মঈদুল হাসান আরো লেখেন, ‘দখলদার সৈন্যদের যুদ্ধ-পরিশ্রান্ত ও হতোদ্যম করে তোলার পর মুক্তিবাহিনীর আট মাস দীর্ঘ সংগ্রামকে চূড়ান্তভাবে জয়যুক্ত করার লক্ষ্যে ৪ঠা ডিসেম্বর থেকে ভারতীয় স্থলবাহিনীর সম্মুখ অভিযান শুরু হয় চারটি অঞ্চল থেকে।...এর সঙ্গে যুক্ত হয় ভারতের বিমান ও নৌশক্তি, মুক্তিযোদ্ধাদের প্রচ্ছন্ন কিন্তু সদা তৎপর সহযোগিতা এবং স্বাধীনতাকামী জনসাধারণের স্বতঃস্ফূর্ত সাহায্য ও সক্রিয় সহযোগিতা।...বস্তুত যুদ্ধারম্ভের সঙ্গে সঙ্গে ভারত-বাংলাদেশ মিলিত বাহিনীর বিজয় সম্পর্কে সন্দেহের অবকাশ কোনো মহলেই ছিল না।’
মূলধারা ’৭১ বই থেকে আরো জানা যায়, ৪ ডিসেম্বর বাংলাদেশের অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রী এক জরুরি লিপিতে ভারতের প্রধানমন্ত্রীকে জানান, পাকিস্তানের সর্বশেষ আক্রমণের সমুচিত জবাব প্রদানে ভারতীয় বাহিনী এবং বাংলাদেশ মুক্তিবাহিনীর মিলিত ভূমিকা সফলতর হতে পারে, যদি এই দুটি দেশের মধ্যে আনুষ্ঠানিক কূটনৈতিক সম্পর্ক প্রতিষ্ঠিত হয়।
এদিন ভারতীয় স্থলবাহিনী বাংলাদেশে প্রবেশ করে। মুক্তিবাহিনীর সঙ্গে সম্মিলিত বাহিনী এই দিন দর্শনা, ঠাকুরগাঁ, চরখাই, গাজীপুর, শমসেরনগর বিমানক্ষেত্র দখল করে নেয়। মুক্তিবাহিনী এদিন আখাউড়া রেলস্টেশন বাজার এবং গঙ্গাসাগর মুক্ত করে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার পথে যাত্রা করে। আখাউড়া ও ব্রাহ্মণবাড়িয়ার মাঝপথে পাকবাহিনীর সঙ্গে প্রচণ্ড যুদ্ধ হয়। বেঙ্গল রেজিমেন্ট ও মিত্রবাহিনী যৌথভাবে স্থল ও আকাশপথে আখাউড়া ও কসবা আক্রমণ করে। এ যুদ্ধে বহু মুক্তিযোদ্ধা শহীদ হন।
যশোর সেক্টরে মহেশকুণ্ডি ও জীবননগর এলাকায় এবং মেহেরপুর শহরে মুক্তিবহিনীর সঙ্গে সংঘর্ষে বহু পাকসৈন্য হতাহত হয়। রংপুরে হিলি রণক্ষেত্রে তুমুল সংঘর্ষ হয়। দিনাজপুর জেলার সব সীমান্ত বরাবর মুক্তিবাহিনী দুর্বার গতিতে এগিয়ে চলে। মুক্তিবাহিনী দিনাজপুরের বোদা অঞ্চল মুক্ত করে ঠাকুরগাঁওয়ে মিত্রবাহিনীর সঙ্গে যোগ দেয়। বগুড়া জেলার পাঁচবিবি, ধরাদিয়া, পুশনা ও আশপাশের অঞ্চলও মুক্তিবাহিনী দখল করে নেয়। ময়মনসিংহ রণাঙ্গনের কামালপুর ফাঁড়ি যৌথবাহিনীর নিয়ন্ত্রণে আসে। ঠাকুরগাঁও মুক্ত হয়।
কামালপুর ঘাঁটি নিয়ন্ত্রণে আনার বর্ণনা পাওয়া যায় মুক্তিযুদ্ধে ১ নম্বর সেক্টরের কমান্ডার রফিকুল ইসলাম বীর উত্তমের ‘লক্ষ প্রাণের বিনিময়ে’ বইয়ে। কামালপুরে এর আগে একাধিকবার আক্রমণ করেও পুরোপুরি সফল হননি মুক্তিযোদ্ধারা। রফিকুল ইসলাম লিখেছেন, ‘এর আগে কামালপুরের ঘাঁটি প্রথম বেঙ্গল রেজিমেন্টের আক্রমণ প্রতিহত করেছিল। তখন আমাদের অনেক সৈন্য হতাহত হয়। সর্বাত্মক লড়াই শুরু হওয়ার ফলে এবার কামালপুরের ওপর বিমান আক্রমণ চালানোর সুযোগ হয়। এখানে প্রথম বিমান হামলা শুরু হয় ৪ঠা ডিসেম্বর সকাল প্রায় সাড়ে ৯টায়। এই দিন আরো দুইবার বিমান আক্রমণ চলে। বিমান আক্রমণে ঘায়েল হয়ে কামালপুরের শক্রসেনারা ৪ঠা ডিসেম্বর সন্ধ্যা ৭টায় আত্মসমর্পণ করে।’
এদিন যুক্তরাষ্ট্র জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে অবিলম্বে যুদ্ধবিরতি ও নিজ নিজ সীমান্তের ভেতরে সৈন্য প্রত্যাহারের যে প্রস্তাব করে, তার বিরুদ্ধে ভেটো দেয় সোভিয়েত ইউনিয়ন। পোল্যান্ড বিপক্ষে ভোট দেয়। ভোট দেওয়া থেকে বিরত থাকে ফ্রান্স ও ব্রিটেন।