দীর্ঘ জল্পনার অবসান ঘটিয়ে অবশেষে ভারতের মাটিতে পা রাখলেন রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন। বৃহস্পতিবার (৪ ডিসেম্বর) সন্ধ্যায় দিল্লির পালাম বিমানবন্দরে অবতরণ করে পুতিনের বিমান। আর সেখানেই দেখা গেল এক বিরল কূটনৈতিক দৃশ্য—প্রটোকলের তোয়াক্কা না করে পুরনো বন্ধুকে স্বাগত জানাতে বিমানবন্দরে সশরীরে উপস্থিত হলেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি।
সন্ধ্যা ৬টা ৩৫ মিনিট নাগাদ পুতিন দিল্লিতে পৌঁছান। ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধ (Ukraine-Russia War) শুরুর পর অর্থাৎ ২০২২ সালের পর এটিই রুশ প্রেসিডেন্টের প্রথম ভারত সফর। বিশ্ব রাজনীতির চরম অস্থিরতার মধ্যে পুতিনের এই সফর এবং মোদির এই উষ্ণ অভ্যর্থনা ‘Global Politics’ বা বিশ্ব রাজনীতিতে এক বড়সড় বার্তা বলেই মনে করছেন আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকরা।
ব্যক্তিগত রসায়ন ও ‘প্রাইভেট ডিনার’
বিমানবন্দরে উষ্ণ অভ্যর্থনার পরই দুই রাষ্ট্রনেতার ব্যক্তিগত রসায়নের বিষয়টি সামনে আসে। সংবাদমাধ্যম এনডিটিভি সূত্রে খবর, বৃহস্পতিবার রাতেই রুশ প্রেসিডেন্টকে নিজের বাসভবনে এক একান্ত ‘Private Dinner’ বা ব্যক্তিগত নৈশভোজে আপ্যায়ন করবেন প্রধানমন্ত্রী মোদি। কূটনৈতিক মহলে এই ‘Dinner Diplomacy’-র গুরুত্ব অপরিসীম। আনুষ্ঠানিক বৈঠকের বাইরে এই ঘরোয়া আলোচনাই অনেক সময় বড় সিদ্ধান্তের পথ প্রশস্ত করে।
শুক্রবার (৫ ডিসেম্বর) হায়দ্রাবাদ হাউসে শুরু হবে মূল দ্বিপাক্ষিক বৈঠক। তার আগে পুতিনকে প্রথা মেনে আনুষ্ঠানিকভাবে ‘Guard of Honour’ প্রদান করা হবে। বৈঠকের পর দুই নেতা যৌথ বিবৃতি বা ‘Joint Statement’ দেবেন বলে জানা গেছে।
আলোচনার টেবিলে সামরিক ও বাণিজ্য চুক্তি
২৩তম ভারত-রাশিয়া বার্ষিক শীর্ষ সম্মেলনে (India-Russia Annual Summit) যোগ দিতে আসা পুতিনের ঝুলিতে রয়েছে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ এজেন্ডা। মূলত প্রতিরক্ষা (Defense), বাণিজ্য (Trade) এবং জ্বালানি তেল (Crude Oil)—এই তিনটি স্তম্ভের ওপর ভিত্তি করেই এবারের আলোচনা এগোবে।
তবে সবার নজর রাশিয়ার পার্লামেন্টে সদ্য অনুমোদিত একটি বিশেষ সামরিক চুক্তির দিকে। বিবিসি-র প্রতিবেদন অনুযায়ী, পুতিনের সফরের ঠিক আগেই রুশ পার্লামেন্ট ভারতের সঙ্গে একটি ‘Logistics Support Agreement’ অনুমোদন করেছে। এই চুক্তি বাস্তবায়িত হলে, দুই দেশের সামরিক বাহিনী একে অপরের সামরিক ঘাঁটি ও পরিকাঠামো রসদ সরবরাহের জন্য ব্যবহার করতে পারবে। এটি ভারত ও রাশিয়ার প্রতিরক্ষা সহযোগিতায় (Defense Cooperation) এক নতুন মাইলফলক হতে পারে।
ক্রেমলিনের বার্তা ও ভারতের অবস্থান
পুতিনের বিমান দিল্লির মাটি ছোঁয়ার আগেই ক্রেমলিনের মুখপাত্র দিমিত্রি পেসকভ এক তাৎপর্যপূর্ণ বার্তা দিয়েছেন। তিনি বলেন, “দ্বিপাক্ষিক সহযোগিতার ক্ষেত্রে রাশিয়া কতটা হাত বাড়িয়ে দেবে, তা নির্ভর করছে ভারত কতটা এগিয়ে আসতে চায়, তার ওপরে।” পেসকভের এই মন্তব্য বুঝিয়ে দিচ্ছে, মস্কো নয়াদিল্লির সঙ্গে সম্পর্ক আরও গভীর করতে প্রস্তুত, এখন বল ভারতের কোর্টে।
পশ্চিমি বিশ্বের নানা নিষেধাজ্ঞা বা ‘Sanctions’ এবং চাপের মুখে দাঁড়িয়েও ভারত যে রাশিয়ার সঙ্গে তার পুরনো বন্ধুত্ব অটুট রাখতে চায়, পুতিনের এই রাজকীয় অভ্যর্থনা সেটাই প্রমাণ করে। এখন দেখার বিষয়, আগামীকালের বৈঠকে দুই রাষ্ট্রনেতা প্রতিরক্ষা ও বাণিজ্যে নতুন কোন ‘Deal’ স্বাক্ষর করেন।