ক্রাইস্টচার্চের হ্যাগলি ওভালে চিত্রনাট্যটা যেন স্বাগতিক নিউজিল্যান্ডের পক্ষেই লেখা ছিল। তৃতীয় দিন শেষে চালকের আসনে থাকা কিউইরা চতুর্থ দিনের শুরুতেও ছিল অপ্রতিরোধ্য। একপর্যায়ে মনে হচ্ছিল, পঞ্চম দিনে আর খেলা গড়াবে না, ম্যাচ শেষ হয়ে যাবে সময়ের আগেই। কারণ, ৫৩১ রানের ‘অসম্ভব’ Target তাড়া করতে নেমে মাত্র ৭২ রানেই ৪ উইকেট হারিয়ে প্রবল বিপর্যয়ের মুখে পড়েছিল ওয়েস্ট ইন্ডিজ। কিন্তু ক্রিকেট যে গৌরবময় অনিশ্চয়তার খেলা, তা আবারও প্রমাণ করলেন শাই হোপ এবং জাস্টিন গ্রিভস। খাদের কিনারা থেকে দলকে টেনে তুলে হোপ-গ্রিভস জুটি উপহার দিলেন এক অবিশ্বাস্য প্রতিরোধ, যা টেস্ট ক্রিকেটের ইতিহাসে অন্যতম সেরা ‘Resilience’-এর গল্প হয়ে থাকার দাবি রাখে।
পাহাড়সম লক্ষ্য ও টপ অর্ডারের ধস
৪ উইকেটে ৪১৭ রান নিয়ে দিন শুরু করা নিউজিল্যান্ড আজ সকালের সেশনে বেশ দ্রুতগতিতে রান তোলার চেষ্টা করে। রাচিন রবীন্দ্রর ১৭৬ এবং টম লাথামের ১৪৫ রানের ওপর ভর করে দলীয় ৪৬৬ রানে নিজেদের দ্বিতীয় ইনিংস ঘোষণা (Declaration) করে স্বাগতিকরা। এর ফলে ওয়েস্ট ইন্ডিজের সামনে জয়ের লক্ষ্য দাঁড়ায় ৫৩১ রান। টেস্ট ইতিহাসের ১৪৭ বছরে আজ পর্যন্ত কোনো দল চতুর্থ ইনিংসে ৪১৮ রানের বেশি তাড়া করে জিততে পারেনি। অর্থাৎ, জিততে হলে ক্যারিবিয়ানদের গড়তে হবে নতুন বিশ্বরেকর্ড।
এমন চাপে ব্যাটিংয়ে নেমে শুরুতেই কিউই পেসারদের তোপের মুখে পড়ে ওয়েস্ট ইন্ডিজ। জ্যাকব ডাফি ও ম্যাট হেনরির সুইং ও বাউন্সে দিশেহারা হয়ে পড়ে সফরকারীদের Top Order। দলীয় ২৪ রানে ওপেনার জন ক্যাম্পবেল এবং এরপর তেজনারায়ণ চন্দরপল, আলিক অ্যাথানাজ ও অধিনায়ক রোস্টন চেজ দ্রুত বিদায় নিলে স্কোরবোর্ডে মাত্র ৭২ রান উঠতেই ৪ উইকেট হারায় তারা। হারের শঙ্কা তখন প্রবল।
হোপ-গ্রিভসের ঐতিহাসিক প্রতিরোধ
দিনের খেলা তখনো প্রায় দেড় সেশন বাকি। নিউজিল্যান্ডের বোলাররা যখন উৎসবের প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন, ঠিক তখনই দৃশ্যপটে আভির্ভূত হন শাই হোপ এবং জাস্টিন গ্রিভস। পঞ্চম উইকেটে এই দুজন গড়ে তোলেন অবিচ্ছিন্ন ১৪০ রানের এক ইস্পাতদৃঢ় Partnership। কিউই বোলারদের সব আক্রমণ সামলে শাই হোপ তুলে নেন দুর্দান্ত এক সেঞ্চুরি।
দিন শেষে শাই হোপ ১১৬ রানে এবং জাস্টিন গ্রিভস ৫৫ রানে অপরাজিত রয়েছেন। তাঁদের জুটিতে ভর করে ওয়েস্ট ইন্ডিজ দিন শেষ করেছে ৪ উইকেটে ২১২ রান নিয়ে। যেখানে গ্রিভস খেলেছেন ১৪৩ বল এবং হোপ ১৩২ বল—যা প্রমাণ করে টি-টোয়েন্টির যুগেও টেস্ট ক্রিকেটে টিকে থাকার মানসিকতা কতটা জরুরি। হোপের ক্লাস এবং গ্রিভসের ধৈর্য নিউজিল্যান্ডের জয়ের পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
পঞ্চম দিনের রোমাঞ্চকর সমীকরণ
টেস্টের ভাগ্য এখন ঝুলে আছে পঞ্চম ও শেষ দিনের ওপর। হোপ ও গ্রিভসের এই জুটি আগামীকাল কতক্ষণ ক্রিজে টিকতে পারে, তার ওপরই নির্ভর করছে ম্যাচের ফলাফল। গাণিতিক সমীকরণে, ৬ উইকেট হাতে রেখে শেষ দিনে জয়ের জন্য ওয়েস্ট ইন্ডিজের প্রয়োজন আরও ৩১৯ রান। লক্ষ্যটা এখনো বহু দূর, এবং কাজটা প্রায় অসম্ভব। তবে চতুর্থ দিনের শেষ সেশনে হোপ-গ্রিভস যে সাহসিকতা দেখিয়েছেন, তা ক্রিকেটপ্রেমীদের মনে করিয়ে দিচ্ছে—‘ইট ইজ নট ওভার আনটিল ইট ইজ ওভার’।
সংক্ষিপ্ত স্কোর:
নিউজিল্যান্ড: ২৩১ ও ৪৬৬/৮ ডিক্লেয়ার (রবীন্দ্র ১৭৬, ল্যাথাম ১৪৫, ব্রেসওয়েল ২৪; রোচ ৫/৭৮, শিল্ডস ২/৭৪)।
ওয়েস্ট ইন্ডিজ: ১৬৭ ও ২১২/৪ (হোপ ১১৬*, গ্রিভস ৫৫*, ক্যাম্পবেল ১৫; ডাফি ২/৬৫, হেনরি ১/২৯)।
চতুর্থ দিন শেষে ওয়েস্ট ইন্ডিজ ৩১৯ রানে পিছিয়ে।