শুক্রবার ছুটির বিকেল। সাপ্তাহিক ছুটির আনন্দ উপভোগ করতে রাজধানীর মিরপুর জাতীয় চিড়িয়াখানায় তখন উপচে পড়া ভিড়। নারী, শিশুসহ হাজারো দর্শনার্থীর কোলাহলে মুখর পরিবেশ। ঠিক তখনই ঘটে এক অবিশ্বাস্য ও লোমহর্ষক ঘটনা। বিকেল পৌনে ৫টা নাগাদ হঠাৎ খবর ছড়িয়ে পড়ে—খাঁচা ভেঙে বেরিয়ে এসেছে বনের রাজা সিংহ! মুহূর্তেই আনন্দ ভ্রমণ রূপ নেয় বিভীষিকায়। শুরু হয় তীব্র আতঙ্ক আর দিগ্বিদিক ছোটাছুটি। প্রায় আড়াই ঘণ্টার এক ‘হাই ভোল্টেজ’ নাটকের পর অবশেষে বিশেষ ব্যবস্থায় খাঁচায় ফেরানো সম্ভব হয়েছে সেই সিংহটিকে।
বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা: আতঙ্কের আড়াই ঘণ্টা
চিড়িয়াখানা কর্তৃপক্ষ সূত্রে জানা যায়, শুক্রবার (৫ ডিসেম্বর) বিকেলের দিকে নিরাপত্তা বেষ্টনী বা ‘সেফটি ব্যারিয়ার’ টপকে আচমকাই লোকালয়ে চলে আসে সিংহটি। এই খবর ‘ওয়াকিটকি’-তে ছড়িয়ে পড়তেই চিড়িয়াখানা জুড়ে ‘ইমার্জেন্সি অ্যালার্ম’ বেজে ওঠে। দর্শনার্থীদের সুরক্ষায় তাৎক্ষণিকভাবে নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা হয় এবং দ্রুততম সময়ে সাধারণ মানুষকে নিরাপদ আশ্রয়ে সরিয়ে নেওয়া হয় (Evacuation)। যদিও এই ঘটনায় কোনো হতাহতের বা ‘ক্যাজুয়ালিটি’র (Casualties) খবর পাওয়া যায়নি, তবে উপস্থিত দর্শনার্থীদের মধ্যে চরম ভীতি কাজ করছিল।
যেভাবে নিয়ন্ত্রণে এল পশুরাজ
সিংহটি খাঁচা থেকে বেরিয়ে যাওয়ার পর থেকেই চিড়িয়াখানার বিশেষ প্রশিক্ষিত ‘এনিমেল ম্যানেজমেন্ট টিম’ (Animal Management Team) এবং পশুচিকিৎসক দল বা ‘ভেটেরিনারি স্কোয়াড’ মাঠে নামে। প্রায় এক ঘণ্টার নিরলস ও সতর্ক প্রচেষ্টায় দূর থেকে ‘ট্রাঙ্কুলাইজার গান’ (Tranquilizer Gun) ব্যবহার করে সিংহটিকে লক্ষ্য করে চেতনানাশক ইনজেকশন ছোড়া হয়। অচেতন হয়ে পড়ার পর সম্পূর্ণ অক্ষত অবস্থায় তাকে পুনরায় খাঁচায় বন্দি করা হয়।
চিড়িয়াখানার পরিচালক রফিকুল ইসলাম তালুকদার বিষয়টি নিশ্চিত করে জানান, ‘‘সিংহটির শারীরিক অবস্থা বর্তমানে সম্পূর্ণ স্বাভাবিক এবং ‘স্টেবল’ (Stable) রয়েছে। আমাদের পশুচিকিৎসক দল তাকে নিবিড় পর্যবেক্ষণে (Observation) রেখেছেন।’’
তদন্তে ‘প্রোব কমিটি’: ৩ দিনের সময়সীমা
খাঁচার মতো সুরক্ষিত স্থান থেকে কীভাবে একটি হিংস্র প্রাণী বেরিয়ে এল, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে জনমনে। ঘটনাটিকে অত্যন্ত গুরুত্বসহকারে দেখছে কর্তৃপক্ষ। ঘটনার প্রকৃত কারণ উদ্ঘাটনে প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের পরিচালক (প্রশাসন) ডা. মো. বয়জার রহমানকে প্রধান করে দুই সদস্যবিশিষ্ট একটি তদন্ত কমিটি বা ‘প্রোব কমিটি’ (Probe Committee) গঠন করা হয়েছে। কমিটির অপর সদস্য হলেন উপপরিচালক (খামার) মো. শরিফুল হক।
আগামী তিন কার্যদিবসের মধ্যে এই কমিটিকে প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ড. মো. আবু সুফিয়ানের নিকট বিস্তারিত তদন্ত প্রতিবেদন বা ‘ইনভেস্টিগেশন রিপোর্ট’ (Investigation Report) জমা দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
নিরাপত্তা ব্যবস্থা ও বর্তমান পরিস্থিতি
মিরপুর চিড়িয়াখানায় বর্তমানে মোট ৫টি সিংহ রয়েছে। শুক্রবারের এই অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনার পর চিড়িয়াখানা কর্তৃপক্ষ দর্শনার্থী ও গণমাধ্যমের সহযোগিতার জন্য কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছে। পরিচালক জানিয়েছেন, পরিস্থিতি এখন সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে এবং চিড়িয়াখানা দর্শনার্থীদের জন্য পুরোপুরি নিরাপদ। নিয়মিত কার্যক্রম বা ‘রুটিন অপারেশন’ (Routine Operation) আগের মতোই চলবে। ভবিষ্যতে যাতে এমন ‘সিকিউরিটি ব্রিচ’ না ঘটে, সে জন্য আরও কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণের আশ্বাস দিয়েছে কর্তৃপক্ষ।