ঐতিহাসিক ৬ ডিসেম্বর—ভারতীয় রাজনীতিতে এক স্পর্শকাতর দিন। ১৯৯২ সালের এই দিনেই ধুলিসাৎ হয়েছিল অযোধ্যার বাবরি মসজিদ। সেই ঘটনার তিন দশক পেরিয়ে গেলেও বিতর্কের আঁচ নেভেনি। সেই আগুনেই এবার নতুন করে ঘৃতাহুতি দিল পশ্চিমবঙ্গের মুর্শিদাবাদে বাবরি মসজিদের আদলে একটি নতুন মসজিদ নির্মাণের উদ্যোগ। রেজিনগরের এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে বিধানসভা নির্বাচনের প্রাক্কালে রাজ্যের রাজনীতিতে ‘রিলিজিয়াস পোলারাইজেশন’ বা ধর্মীয় মেরুকরণের ছক স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
মুর্শিদাবাদে বাবরির ছায়া ও জনস্রোত
শনিবার (৬ ডিসেম্বর), বাবরি ধ্বংসের বর্ষপূর্তির দিনেই মুর্শিদাবাদের রেজিনগরে প্রস্তাবিত এই মসজিদের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করা হয়। অনুষ্ঠানকে ঘিরে রাজ্যের বিভিন্ন জেলা থেকে হাজার হাজার মানুষের সমাগম ঘটে, যা কার্যত জনসমুদ্রে রূপ নেয়। আবেগের বশবর্তী হয়ে অনেককেই হাতে ইট নিয়ে এই কর্মসূচিতে যোগ দিতে দেখা যায়।
এই উদ্যোগের মূল কাণ্ডারি দল থেকে বহিষ্কৃত এবং বিদ্রোহী বিধায়ক হুমায়ুন কবীর। উদ্বোধনী মঞ্চ থেকে তিনি শাসকদল তৃণমূল এবং বিরোধী বিজেপি—উভয়কেই কড়া ভাষায় হুঁশিয়ারি দেন। রাজনৈতিক মহলের মতে, হুমায়ুন কবীর এই সেন্টিমেন্টকে কাজে লাগিয়ে নিজের রাজনৈতিক অবস্থান শক্ত করতে চাইছেন, যা আগামী দিনে মুর্শিদাবাদের রাজনৈতিক সমীকরণে বড় প্রভাব ফেলতে পারে।
তৃণমূলের ‘সংহতি’ বনাম কৌশলগত অবস্থান
বাবরি ধ্বংসের দিনটিকে তৃণমূল কংগ্রেস দীর্ঘদিন ধরেই ‘সংহতি দিবস’ হিসেবে পালন করে আসছে। তবে মুর্শিদাবাদের এই ঘটনা শাসকদলকে কিছুটা অস্বস্তিতে ফেলেছে। একদিকে সংখ্যালঘু ভোটব্যাংক রক্ষা, অন্যদিকে সংখ্যাগুরুদের বিরাগভাজন না হওয়া—এই দুইয়ের ভারসাম্য বজায় রাখতে মেপে পা ফেলছে তারা।
কলকাতার মেয়োরোডে আয়োজিত সংহতি দিবসের সভায় রাজ্যের মন্ত্রী ও কলকাতার মেয়র ফিরহাদ হাকিম নাম না করেই বাবরির আদলে মসজিদ নির্মাণের সমালোচনা করেন। তিনি বলেন, “মানুষের মধ্যে যে ভরসা ছিল যে এই ভারতবর্ষ আমার, সেই ভরসা ভেঙে দিয়ে মানুষের বিশ্বাসের ওপর আঘাত সৃষ্টি করেছে বিজেপি।” তৃণমূলের বার্তা স্পষ্ট—তারা বিভাজনের রাজনীতি চায় না, বরং উন্নয়নের ‘ন্যারেটিভ’ সামনে রাখতে চায়। দিঘায় জগন্নাথ মন্দির নির্মাণ এবং নিউ টাউনে দুর্গা মন্দির তৈরির পরিকল্পনা ঘোষণা করে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সরকার ইতিমধ্যেই তাদের ‘ধর্মনিরপেক্ষ’ ইমেজের পাশাপাশি ‘সফট হিন্দুত্ব’-এর কৌশলও বজায় রেখেছে।
বিজেপির কড়া আক্রমণ: ‘তোষণ’ বনাম ‘সংস্কৃতি’
মুর্শিদাবাদের ঘটনাকে হাতিয়ার করে তৃণমূল সরকারের বিরুদ্ধে তোপ দাগতে দেরি করেননি বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারী। বাবরির প্রসঙ্গ টেনে তিনি সরাসরি মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে আক্রমণ করেন। শুভেন্দু বলেন, “বাবরের নাম নিয়ে আমাদের আপত্তি আছে। আজকে প্রমাণ হয়ে গেল মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় কত বড় হিন্দুবিরোধী এবং ভারতীয় সংস্কৃতিবিরোধী।”
বিজেপির এই আগ্রাসী মনোভাব স্পষ্ট করে দিচ্ছে যে, আসন্ন নির্বাচনে তারা এই ইস্যুকে জাতীয়তাবাদের মোড়কে ব্যবহার করে হিন্দু ভোট সংহত করার চেষ্টা করবে।
ভোটের আগে ধর্মের রাজনীতি
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনের আগে প্রধান দুই রাজনৈতিক শক্তি—তৃণমূল ও বিজেপি—ধর্মকে তাদের প্রচারের ‘কি-ফ্যাক্টর’ বা প্রধান হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছে। একদিকে মন্দিরের পাল্টা মসজিদ, অন্যদিকে জাতীয়তাবাদের পাল্টা আঞ্চলিক অস্মিতা—এই দ্বন্দ্বে সাধারণ মানুষের সমস্যাগুলো আড়ালে চলে যাচ্ছে। রেজিনগরের ঘটনা কেবল একটি মসজিদ নির্মাণ নয়, বরং এটি রাজ্যের আসন্ন ‘পলিটিক্যাল এজেন্ডা’ নির্ধারণের একটি ইঙ্গিত। শেষ পর্যন্ত বাংলার মানুষ এই ধর্মীয় মেরুকরণের রাজনীতিতে সাড়া দেবেন কি না, তা সময়ই বলে দেবে।