যুদ্ধের চতুর্থ বর্ষপূর্তির দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে ইউক্রেন যুদ্ধ এক নাটকীয় মোড় নিচ্ছে। একদিকে রণাঙ্গনে চলছে স্মরণকালের ভয়াবহ পাল্টাপাল্টি হামলা, অন্যদিকে কূটনৈতিক টেবিলে বইছে শান্তির সুবাতাস। ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি নিশ্চিত করেছেন যে, শান্তি পরিকল্পনা বা ‘Peace Plan’ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনা অত্যন্ত ইতিবাচক দিকে এগোচ্ছে। জেলেনস্কির এই আশাবাদের সঙ্গে সুর মিলিয়েছেন পশ্চিমা সামরিক জোট ন্যাটোতে (NATO) নিযুক্ত মার্কিন দূত ম্যাথিউ হুইটেকার। তাঁর দাবি, রাশিয়া ও ইউক্রেন একটি ঐতিহাসিক শান্তি চুক্তির (Peace Treaty) খুবই কাছাকাছি পৌঁছেছে।
কূটনৈতিক তৎপরতা ও ওয়াশিংটনের বার্তা
দোহায় আয়োজিত একটি উচ্চপর্যায়ের প্যানেল আলোচনায় মার্কিন ন্যাটো দূত ম্যাথিউ হুইটেকার মন্তব্য করেন, মস্কো ও কিয়েভ বিবাদমান অনেক ইস্যুতে ঐকমত্যের পথে রয়েছে। এই মন্তব্যের পরপরই জেলেনস্কি জানান, যুক্তরাষ্ট্রের নবনির্বাচিত প্রশাসনের পাঠানো শান্তি দূত স্টিভ উইটকফ এবং জ্যারেড কুশনারের সঙ্গে তাঁর অত্যন্ত গঠনমূলক আলোচনা হয়েছে। ট্রাম্প প্রশাসনের মধ্যস্থতায় এই আলোচনা যুদ্ধের মোড় ঘুরিয়ে দিতে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
আগামী সোমবার লন্ডনে ফ্রান্স, জার্মানি এবং যুক্তরাজ্যের শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে বৈঠক হওয়ার কথা রয়েছে। সেখানে যুদ্ধ-পরবর্তী নিরাপত্তা কাঠামো (Post-war Security Architecture) নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হবে।
আকাশে আগুনের খেলা: পাল্টাপাল্টি হামলা
শান্তি আলোচনার সমান্তরালে যুদ্ধের মাঠ এখনো উত্তপ্ত। শনিবার রাশিয়ার প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় দাবি করেছে, গত এক সপ্তাহে তারা ইউক্রেনের ‘মিলিটারি-ই ইন্ডাস্ট্রিয়াল কমপ্লেক্স’, জ্বালানি স্থাপনা এবং সামরিক পরিবহন নেটওয়ার্কে মোট পাঁচ দফা বড় ধরনের আঘাত হেনেছে। রুশ বাহিনীর দাবি, তাদের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা (Air Defense System) ইউক্রেনের পাঁচটি নেপচুন ক্রুজ মিসাইল, একটি মার্কিন নির্মিত হিমার্স (HIMARS) রকেট এবং ১,১২০টি ড্রোন ভূপাতিত করেছে।
অন্যদিকে, ইউক্রেনও বসে নেই। কিয়েভ জানিয়েছে, তারা রাশিয়ার দক্ষিণাঞ্চলীয় ক্রাসনোদার বন্দর এবং সামারার একটি গুরুত্বপূর্ণ তেল শোধনাগারের (Oil Refinery) ওপর সফল ড্রোন হামলা চালিয়েছে। ফ্রন্টলাইন বা সম্মুখযুদ্ধে একদিনেই ১০৬টি সংঘর্ষের খবর পাওয়া গেছে, যার মধ্যে পোকরোভস্ক অঞ্চলের লড়াই ছিল সবচেয়ে ভয়াবহ।
শুক্রবার রাতে যুদ্ধের ভয়াবহতা নতুন রূপ নেয়। রাশিয়া ইউক্রেনের ওপর একযোগে ৬৫৩টি ড্রোন ও ৫১টি ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করে। কিয়েভের কাছে একটি গুরুত্বপূর্ণ রেলওয়ে হাব এতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তবে ইউক্রেনীয় বাহিনীর দাবি, তাদের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ৫৮৫টি ড্রোন ও ৩০টি ক্ষেপণাস্ত্র ধ্বংস করতে সক্ষম হয়েছে।
কৃষ্ণসাগরে ‘শ্যাডো ফ্লিট’ বিপর্যয়
যুদ্ধের উত্তাপ ছড়িয়েছে কৃষ্ণসাগরেও। রাশিয়ার তেল পরিবহনে ব্যবহৃত তথাকথিত ‘শ্যাডো ফ্লিট’ (Shadow Fleet)-এর অংশ হিসেবে পরিচিত ট্যাংকার ‘কাইরোস’ বড় ধরণের বিপর্যয়ের মুখে পড়েছে। ইউক্রেনীয় ‘নেভাল ড্রোন’ বা সামুদ্রিক ড্রোনের আঘাতে জাহাজটি ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে বর্তমানে বুলগেরিয়ার উপকূলে ভাসছে।
প্রতিকূল আবহাওয়ার কারণে উদ্ধার অভিযান বা ‘Rescue Operation’ বারবার ব্যাহত হচ্ছে। বুলগেরীয় কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, ট্যাংকারটি এখনো স্থিতিশীল অবস্থায় ভেসে আছে এবং এতে থাকা দশ সদস্যের বহুজাতিক ক্রু নিরাপদ রয়েছেন। জাহাজে প্রায় তিন দিনের খাবার ও পানি মজুত রয়েছে বলে জানা গেছে। এই ঘটনা কৃষ্ণসাগরে বাণিজ্যিক জাহাজের নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে শঙ্কা তৈরি করেছে।