ফুটবল এবং রাজনীতি—দুই মেরুর দুই মহাতারকার সম্পর্ক এখন নতুন উচ্চতায়। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং পর্তুগিজ ফুটবল জাদুকর ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদোর মধ্যে গড়ে ওঠা উষ্ণ সম্পর্ক এখন আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে। হোয়াইট হাউসের ওভাল অফিসে ঐতিহাসিক সফরের পর এবার প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে ফোন করে ধন্যবাদ জানালেন ‘সিআরসেভেন’। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ‘Truth Social’-এ এই ফোনকলের বিষয়টি নিজেই নিশ্চিত করেছেন ট্রাম্প, যেখানে তিনি রোনালদোকে কেবল একজন ক্রীড়াবিদ হিসেবে নয়, ‘অসাধারণ ব্যক্তিত্ব’ হিসেবেও অভিহিত করেছেন।
সম্প্রতি সৌদি প্রতিনিধি দলের অংশ হিসেবে হোয়াইট হাউসে আমন্ত্রিত হয়েছিলেন রোনালদো। সেখানে এক রাজকীয় নৈশভোজ বা ‘State Dinner’-এ অংশ নেন তিনি। সেই সফরের রেশ কাটতে না কাটতেই রোনালদোর এই ফোনকল দুই বৈশ্বিক আইকনের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ককে আরও সুদৃঢ় করল।
ট্রাম্পের উচ্ছ্বাস: ‘এর চেয়ে ভালো আর কেউ হয় না’
রোনালদোর ফোনকল পেয়ে আবেগাপ্লুত ট্রাম্প তার নিজস্ব সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্ম ট্রুথ সোশ্যালে লিখেছেন, “ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো, মহান ফুটবলার, আমাকে ফোন করে হোয়াইট হাউস ও ওভাল অফিসে তার সফরের জন্য ধন্যবাদ জানালেন। কী অবিশ্বাস্য মানুষ তিনি—কেবল একজন ‘Athlete’ হিসেবেই নন, একজন ব্যক্তি হিসেবেও। এর থেকে ভালো আর কেউ হয় না!”
এর আগে হোয়াইট হাউসের ওই নৈশভোজে রোনালদোর প্রতি নিজের মুগ্ধতা প্রকাশ করেছিলেন ট্রাম্প। রোনালদোকে ‘বিশ্ব বদলে দেওয়ার ক্ষমতা রাখেন’ এমন ব্যক্তিদের তালিকায় রেখেছিলেন। সফরের স্মৃতি হিসেবে ট্রাম্প রোনালদোকে হোয়াইট হাউসের প্রতীকী ‘Gold Key’ বা স্বর্ণের চাবি উপহার দেন, যা সাধারণত রাষ্ট্রপ্রধান বা বিশেষ অতিথিদের সম্মাননা হিসেবে দেওয়া হয়। হোয়াইট হাউসের অফিসিয়াল ভিডিওতে ক্যাপশন দেওয়া হয়েছিল ‘Two GOATs’ (সর্বকালের সেরা দুই), যা ইন্টারনেটে ব্যাপক সাড়া ফেলে।
ব্যারনের প্রিয় তারকা ও বাবার সম্মান বৃদ্ধি
এই সফরের সবচেয়ে আকর্ষণীয় দিক ছিল ট্রাম্পের পারিবারিক আবহ। ট্রাম্প মজা করে জানান, রোনালদোর সঙ্গে এই সাক্ষাৎ তার কনিষ্ঠ পুত্র ব্যারন ট্রাম্পের কাছে বাবার গুরুত্ব বাড়িয়ে দিয়েছে।
নৈশভোজে ট্রাম্প হাস্যরসাত্মকভাবে বলেন, “আমার ছেলে রোনালদোর বিশাল ভক্ত। আর রোনালদো আজ এখানে। ব্যারন তার সঙ্গে দেখা করতে পেরেছে, আর আমি মনে করি শুধু আপনাকে পরিচয় করিয়ে দেওয়ার কারণে সে তার বাবাকে একটু বেশি সম্মান করছে এখন। আপনাদের দু’জনকে ধন্যবাদ। সত্যিই এটি একটি ‘Honor’।”
সমালোচনার ঝড় ও বোনেদের কড়া জবাব
৪০ বছর বয়সী রোনালদোর এই হোয়াইট হাউস সফর এবং ট্রাম্পের সঙ্গে সখ্যতাকে সবাই সহজভাবে নেননি। পশ্চিমা বিশ্বের একাংশ এবং সোশ্যাল মিডিয়ায় অনেকেই রোনালদোর সমালোচনা করেছেন। তবে বরাবরের মতোই ভাইয়ের ঢাল হয়ে দাঁড়িয়েছেন রোনালদোর দুই বোন—এলমা ও ক্যাটিয়া অ্যাভেইরো।
এলমা তার ইনস্টাগ্রাম স্টোরিতে সমালোচকদের ‘Clowns’ বা ভাঁড় হিসেবে উল্লেখ করে লেখেন, “এই ভাঁড়গুলো এখনও বুঝতে পারেনি যে, অন্যদের মতামত নিয়ে সে (রোনালদো) এক বিন্দুও ভাবে না? এটা তাদের জন্য নয় যারা চায়, বরং তাদের জন্য যারা সামলাতে পারে। ওদের বলার মতো আর কিছু নেই।”
অন্যদিকে, বোন ক্যাটিয়া আরও একধাপ এগিয়ে বলেন, “সবকিছু ছিল শুধু কাজের ফল। হোয়াইট হাউসে একটি সফর, আর সঙ্গে সঙ্গে যেন এক আবেগের ‘Nuclear Explosion’ ঘটে গেল! ভণ্ডামির শেষ নেই। এমন এক হুঙ্কার উঠেছে যে ভয় লাগে। যেন ক্রিশ্চিয়ানো দুনিয়ার শেষ ঘোষণা করেছে।”
মাঠের লড়াই ও ১০০০ গোলের মিশন
রাজনীতির মাঠের বাইরে নিজের আসল আঙিনা, অর্থাৎ ফুটবলেও অবিশ্বাস্য ফর্মে আছেন আল-নাসরের এই মহাতারকা। ৪০ বছর বয়সেও তার ফিটনেস এবং গোলক্ষুধা তরুণদের ঈর্ষার কারণ। চলতি মৌসুমে মাত্র নয় ম্যাচে ১০ গোল করে লিগের শীর্ষ গোলদাতাদের দৌড়ে ভালোভাবেই আছেন তিনি। ফুটবল ইতিহাসের প্রথম খেলোয়াড় হিসেবে ১,০০০ গোলের ‘Milestone’ স্পর্শ করার দিকে দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছেন।
আগামী ১০ ডিসেম্বর আল ওয়াহদার বিপক্ষে প্রীতি ম্যাচে মাঠে নামবে আল-নাসর। এদিকে, ২০২৬ বিশ্বকাপই যে পর্তুগালের জার্সিতে তার শেষ বড় টুর্নামেন্ট, তা আগেই নিশ্চিত করেছেন রোনালদো। বিশ্বকাপ নিয়ে নিজের দর্শন ব্যাখ্যা করতে গিয়ে গত মাসে তিনি বলেছিলেন, “যদি আমাকে জিজ্ঞেস করেন, বিশ্বকাপ জেতা কি তোমার স্বপ্ন?—না, এটা আমার স্বপ্ন নয়। বিশ্বকাপ জিতলেও আমার নাম ফুটবলের ইতিহাসে আর বদলাবে না। আমি মুহূর্তটাকে উপভোগ করতে চাই। এই মুহূর্তই আমাদের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।”