ব্রাজিলিয়ান ফুটবলের ইতিহাসে সান্তোস এক আবেগের নাম, ‘ফুটবল সম্রাট’ পেলের স্মৃতিবিজড়িত এই ক্লাবটিই দাঁড়িয়েছিল অস্তিত্ব সংকটের মুখে। শঙ্কায় ছিল রেলিগেশন বা অবনমনের। শৈশবের ক্লাবের এমন ক্রান্তিলগ্নে দর্শক হয়ে গ্যালারিতে বসে থাকতে পারেননি ক্লাবের ‘ঘরের ছেলে’ নেইমার। গুরুতর ‘Meniscus Injury’ (হাঁটুর লিগামেন্টের চোট) উপেক্ষা করেই মাঠে নেমেছিলেন, লক্ষ্য ছিল একটাই—প্রিয় ক্লাবকে রক্ষা করা। সেই ‘সারভাইভাল মিশন’-এ সফল ব্রাজিলের এই পোস্টার বয়। ব্রাজিলিয়ান সিরি আ-তে নিজেদের শেষ ম্যাচে দুর্দান্ত জয়ে লিগে টিকে থাকা কেবল নিশ্চিতই করেনি সান্তোস, বরং মহাদেশীয় টুর্নামেন্টেও জায়গা করে নিয়েছে। তবে মিশন শেষে এবার নিজেকে সময় দেওয়ার পালা; অস্ত্রোপচারের টেবিলে যেতে হচ্ছে নেইমারকে।
দাপুটে জয়ে টিকে গেল সান্তোস
সমীকরণটা ছিল সহজ অথচ স্নায়ুক্ষয়ী। অবনমন বা Relegation এড়াতে ক্রুজেইরোর বিপক্ষে লিগের শেষ ম্যাচটিতে হার এড়াতেই হতো সান্তোসকে। সোমবার (৮ ডিসেম্বর) ঘরের মাঠ ভিলা বেলমিরোয় সেই সমীকরণকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে দাপুটে জয় দিয়েই মৌসুম শেষ করল তারা। ম্যাচের প্রথমার্ধে মাত্র দুই মিনিটের ব্যবধানে জাদুকরী মুহূর্ত উপহার দেন থাকিয়ানো, তার জোড়া গোলেই চালকের আসনে বসে সান্তোস। দ্বিতীয়ার্ধে জোয়াও স্মিদের গোলে ৩-০ ব্যবধানের বড় জয় নিশ্চিত হয়।
যদিও এই ম্যাচে নেইমার নিজে কোনো গোল বা অ্যাসিস্ট পাননি, কিন্তু পুরো ম্যাচে তার উপস্থিতি এবং প্লে-মেকিং দলের আত্মবিশ্বাস বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছিল। এই জয়ে ৩৮ ম্যাচে ১২ জয় ও ১১ ড্রয়ে ৪৭ পয়েন্ট নিয়ে লিগ টেবিলে ১২তম স্থানে থেকে মৌসুম শেষ করল সান্তোস। এর ফলে আগামী মৌসুমে লাতিন আমেরিকার মর্যাদাপূর্ণ ক্লাব টুর্নামেন্ট ‘Copa Sudamericana’-তে খেলার যোগ্যতা অর্জন করেছে নেইমারের দল।
ইনজুরি বনাম নিবেদন: নেইমারের ত্যাগ
স্বস্তির জয়ের পর সান্তোস শিবিরে উৎসবের আমেজ থাকলেও, নেইমারের ব্যক্তিগত পরিস্থিতি বেশ জটিল। মৌসুমের শেষটা ভালোভাবে হলেও, এই ৩৩ বছর বয়সী সুপারস্টার নিশ্চিত করেছেন যে, ক্লাবের প্রয়োজনেই তিনি এতদিন অস্ত্রোপচার করাননি। এখন ছুটির সময়েই বাঁ হাঁটুর মেনিস্কাসে অস্ত্রোপচার বা Surgery করাবেন তিনি।
ম্যাচ পরবর্তী সংবাদ সম্মেলনে নেইমার তার মানসিক ও শারীরিক লড়াইয়ের কথা অকপটে স্বীকার করেন। তিনি বলেন, “আমি এখানে এসেছি আমার সর্বোচ্চটা দিয়ে সাহায্য করতে। গত কয়েকটা সপ্তাহ আমার জন্য অত্যন্ত কঠিন ছিল। ‘Mentally’ (মানসিকভাবে) আমি পুরোপুরি ভেঙে পড়েছিলাম। যারা আমাকে আবার উঠে দাঁড়াতে সাহায্য করেছে, তাদের প্রতি আমি কৃতজ্ঞ। ইনজুরি, হাঁটুর সমস্যা সব মিলিয়ে এখন বিশ্রামের সময়। এরপরই হাঁটুর অস্ত্রোপচার হবে।”
উল্লেখ্য, চোট ধরা পড়ার পরও স্পোর্ত ও জুভেনতুদের বিপক্ষে চারটি গোল করেছিলেন নেইমার, যা সান্তোসের অবনমন এড়ানোর পথে বড় ভূমিকা রেখেছে। নেইমার যোগ করেন, “শেষ কয়েকটি ম্যাচে আমাদের পারফরম্যান্সের পুরস্কারই হলো কোপা সুদামেরিকানা। সান্তোস আরও অনেক উঁচুতে থাকার যোগ্য।”
ভবিষ্যৎ নিয়ে ধোঁয়াশা: ২০২৬ পর্যন্ত সান্তোসেই?
সান্তোস ভক্তদের মনে এখন একটাই প্রশ্ন—আগামী মৌসুমে কি নেইমারকে ভিলা বেলমিরোতে দেখা যাবে? ক্লাবে নেইমারের ভবিষ্যৎ বা ‘Future’ নিয়ে ধোঁয়াশা এখনও কাটেনি। যদিও নেইমার স্পষ্ট ইঙ্গিত দিয়েছেন যে, ২০২৬ সাল পর্যন্ত সান্তোসেই থাকার ইচ্ছাকে তিনি অগ্রাধিকার দিচ্ছেন, তবুও সরাসরি কোনো ঘোষণা দেননি।
এ প্রসঙ্গে নেইমার বলেন, “জানি না। আমি তাদের বলেছিলাম ম্যাচগুলো শেষ হওয়ার পর সিদ্ধান্ত নিতে। এখন আমি এক সপ্তাহ বিশ্রাম নিতে চাই, ফুটবল ভুলে থাকতে চাই। কিন্তু, অবশ্যই, আমার হৃদয় সবসময় সান্তোসের। সান্তোসকেই আমি ‘Priority’ দেব।”
নেইমারের এই মন্তব্যে সান্তোস সমর্থকদের মনে আশার সঞ্চার হলেও, ‘Transfer Market’-এর জল্পনা পুরোপুরি থামছে না। তবে আপাতত অস্ত্রোপচার এবং সুস্থ হয়ে ওঠাই এই ব্রাজিলিয়ান জাদুকরের প্রধান লক্ষ্য।