কূটনৈতিক সম্পর্কের রসায়ন বোঝা বড়ই দায়! একদিকে মার্কিন জাতীয় নিরাপত্তা রিপোর্টে (National Security Report) ভারতকে কৌশলগত মিত্র হিসেবে উল্লেখ করে সুসম্পর্ক বজায় রাখার বার্তা দেওয়া হচ্ছে, আর অন্যদিকে খোদ মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বাণিজ্যের ক্ষেত্রে ভারতের ওপর খড়্গহস্ত হওয়ার ইঙ্গিত দিচ্ছেন। এবার সরাসরি ভারতের কৃষি পণ্য, বিশেষ করে চালের ওপর নতুন করে শুল্ক বা ‘Tariff’ আরোপের হুমকি দিলেন ট্রাম্প। তাঁর অভিযোগ, ভারত মার্কিন বাজারে চাল ‘Dumping’ করছে, যা আমেরিকার অর্থনীতিকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে।
হোয়াইট হাউসের বৈঠকে ক্ষোভের বিস্ফোরণ
সোমবার (৮ ডিসেম্বর) হোয়াইট হাউসে একটি উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে ভারতের বাণিজ্য নীতি নিয়ে নিজের অসন্তোষ প্রকাশ করেন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প। উপস্থিত মার্কিন রাজস্ব সচিব (Treasury Secretary) স্কট বেসেন্টকে লক্ষ্য করে ট্রাম্প সরাসরি প্রশ্ন ছোড়েন, ‘‘ভারতকে এই দেশে চাল ডাম্প করার অনুমতি কেন দেওয়া হচ্ছে? তাদের তো শুল্ক দেওয়ার কথা। তাদের ক্ষেত্রে কি কোনো বিশেষ ‘Exemption’ বা ছাড় রয়েছে?’’
জবাবে স্কট বেসেন্ট জানান, ভারতীয় চালের ক্ষেত্রে আমদানি শুল্কে কোনো ছাড় নেই এবং দুই দেশের মধ্যে ‘Trade Negotiation’ বা বাণিজ্য আলোচনা অব্যাহত রয়েছে। তবে এতে শান্ত হননি ট্রাম্প। তিনি পাল্টা হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, ‘‘ভারত এভাবে যুক্তরাষ্ট্রে চাল ডাম্প করতে পারে না।’’ ট্রাম্পের এই মন্তব্যে স্পষ্ট যে, চলমান বাণিজ্য আলোচনায় ভারত যদি মার্কিন শর্তে রাজি না হয়, তবে চাল আমদানির ওপর বড় ধরনের শুল্কের বোঝা চাপতে পারে।
কূটনৈতিক টানাপড়েন ও ‘অপারেশন সিঁদুর’ প্রসঙ্গ
সাম্প্রতিক সময়ে শুল্ক ইস্যুকে কেন্দ্র করে ওয়াশিংটন ও নয়াদিল্লির সম্পর্কের পারদ ওঠানামা করছে। এর আগে ভারতের ওপর ৫০ শতাংশ শুল্ক চাপিয়ে দিয়েছিলেন ট্রাম্প। যদিও বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের খবর অনুযায়ী, দ্বিপাক্ষিক আলোচনার মাধ্যমে সেই শুল্ক হার কমানোর একটি সম্ভাবনা তৈরি হয়েছিল। কিন্তু সোমবারের এই নতুন হুমকি সেই সম্ভাবনাকে আবারও অনিশ্চয়তার মুখে ঠেলে দিল।
পরিস্থিতি এতটাই জটিল যে, ভারতের বিভিন্ন স্থানে ট্রাম্পের কুশপুত্তলিকা দাহ করার ঘটনাও ঘটেছে। আবার উল্টোদিকে হায়দরাবাদে একটি সড়কের নাম ট্রাম্পের নামে করার গুঞ্জনও শোনা যাচ্ছে।
এরই মাঝে ট্রাম্প আবারও নিজেকে ‘যুদ্ধ-লড়াকু’ নয়, বরং ‘যুদ্ধ-থামানো’ নেতা হিসেবে দাবি করেছেন। তিনি প্রায়শই দাবি করেন যে, তিনি অন্তত ৭-৮টি যুদ্ধ থামিয়েছেন, যার মধ্যে অন্যতম ভারত-পাকিস্তান সংঘাত। ট্রাম্পের দাবি, তিনি বাণিজ্য বা ‘Trade Leverage’-কে হাতিয়ার করে এই দুই পরমাণু শক্তিধর দেশের সংঘাত রুখেছিলেন। বিশেষ করে ‘অপারেশন সিঁদুর’ পরবর্তী সময়ে তিনি এই কৃতিত্ব দাবি করে আসছেন।
দাবির সত্যতা ও ভারতের অবস্থান
ট্রাম্পের এই দাবির সঙ্গে অবশ্য ভারতের সরকারি ভাষ্যের কোনো মিল নেই। নয়াদিল্লি বরাবরই ট্রাম্পের মধ্যস্থতার দাবি নাকচ করে এসেছে। ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মতে, ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে সামরিক পদক্ষেপ বন্ধ করার বিষয়টি সম্পূর্ণ দ্বিপাক্ষিক বা ‘Bilateral’ সমঝোতা। ভারতের দাবি, পাকিস্তানের ‘Director General of Military Operations’ (DGMO) ভারতীয় ডিজিএমও-কে ফোন করে হামলা বন্ধের অনুরোধ জানিয়েছিলেন, যার ফলে সীমান্তে উত্তেজনা কমে।
বাণিজ্যকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করে ট্রাম্প যেভাবে ভূ-রাজনীতি বা ‘Geopolitics’ নিয়ন্ত্রণ করতে চাইছেন, তা ভারতের জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে। চালের ওপর শুল্ক আরোপের এই হুমকি শেষ পর্যন্ত বাস্তবে রূপ নিলে তা কেবল ভারতের রপ্তানি বাণিজ্যেই নয়, দুই দেশের কৌশলগত সম্পর্কেও দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব ফেলবে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।