বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর জন্য ইতালি থেকে ইউরোফাইটার টাইফুন (Eurofighter Typhoon) যুদ্ধবিমান সংগ্রহের সিদ্ধান্ত গৃহীত হওয়ার পর থেকেই সামরিক মহলে এটি আলোচনার কেন্দ্রে। সম্প্রতি বাংলাদেশ বিমানবাহিনী ও ইতালীয় সংস্থা লিওনার্দো এসপিএ-এর মধ্যে এই যুদ্ধবিমান সরবরাহের বিষয়ে 'লেটার অব ইনটেন্ট' (LoI) স্বাক্ষরিত হয়েছে। এই পরিস্থিতিতে প্রশ্ন উঠছে, প্রযুক্তি ও সক্ষমতার নিরিখে এই বিমানটি কতটা শক্তিশালী?
সংবাদমাধ্যম 'তুর্কি টুডে' এবং অন্যান্য সামরিক সূত্র অনুযায়ী, ইউরোফাইটার টাইফুন হলো যুক্তরাজ্য, জার্মানি, ইতালি এবং স্পেনের মতো ইউরোপীয় দেশগুলোর বহুজাতিক সহযোগিতায় উন্নত একটি অত্যাধুনিক সামরিক প্ল্যাটফর্ম। এই যুদ্ধবিমানের প্রধান বৈশিষ্ট্যগুলো তুলে ধরা হলো:
৪.৫ প্রজন্মের মাল্টি-রোল কমব্যাট এয়ারক্রাফট (Multi-Role Combat Aircraft)
ইউরোফাইটারকে ৪.৫ প্রজন্মের একটি 'মাল্টি-রোল কমব্যাট এয়ারক্রাফট' হিসেবে ডিজাইন করা হয়েছে। এর অর্থ হলো, এটি একই সঙ্গে আকাশ-থেকে-আকাশ (Air-to-Air) এবং আকাশ-থেকে-স্থল (Air-to-Ground) উভয় ধরনের মিশনে নিশানা ভেদ করার সক্ষমতা রাখে। এই দ্বৈত সক্ষমতা যুদ্ধক্ষেত্রে বিমানটিকে অসাধারণ কৌশলগত সুবিধা প্রদান করে।
গতি ও নকশার কারিগরি শ্রেষ্ঠত্ব
গতি: দ্বৈত ইঞ্জিন (Twin-Engine) বিশিষ্ট এই বিমানটি প্রতি ঘণ্টা প্রায় ২ হাজার ৪৯৫ কিলোমিটার গতিতে উড়তে সক্ষম। এই উচ্চগতি এটিকে যুদ্ধক্ষেত্রে দ্রুত অবস্থান পরিবর্তন এবং প্রতিপক্ষের নাগাল এড়িয়ে যেতে সাহায্য করে।
নকশা: এতে রয়েছে অত্যাধুনিক 'ডেল্টা-উইং' (Delta-Wing) নকশা। উচ্চ 'থ্রাস্ট রেশিও' (High Thrust Ratio) এবং উন্নত 'ফ্লাইট কন্ট্রোল সিস্টেম'-এর (Flight Control System) সমন্বয়ে নির্মিত এই নকশা বিমানটিকে যুদ্ধক্ষেত্রে প্রতিপক্ষের তুলনায় উল্লেখযোগ্য 'ম্যানুভারেবিলিটি' (Manoeuvrability) এবং সুবিধা প্রদান করে। বিশেষত নিকটবর্তী আকাশযুদ্ধে (Dogfight) এটি অত্যন্ত কার্যকরভাবে লড়াই করার জন্য বিশেষভাবে নকশা করা হয়েছিল।
উন্নত অ্যাভিওনিক্স ও প্রযুক্তি
এই যুদ্ধবিমানে অত্যাধুনিক 'অ্যাভিওনিক্স' (Avionics) এবং সেন্সর প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে:
উন্নত রাডার সিস্টেম (Advanced Radar System): যা দূরবর্তী লক্ষ্যবস্তু শনাক্ত করতে সক্ষম।
ইলেকট্রনিক ওয়ারফেয়ার সরঞ্জাম (Electronic Warfare Equipment): প্রতিপক্ষের রাডার এবং যোগাযোগ ব্যবস্থাকে অকার্যকর করার জন্য।
সেন্সর ফিউশন প্রযুক্তি (Sensor Fusion Technology): এই প্রযুক্তি পাইলটকে একই সময়ে অপারেশনাল এলাকার আকাশ ও স্থল উভয় উপাদান পর্যবেক্ষণ এবং পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করতে সক্ষম করে, যা দ্রুত ও সঠিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে সহায়ক।
অস্ত্র বহনের সক্ষমতা
ইউরোফাইটার টাইফুন ১৩টি বাহ্যিক অস্ত্র স্টেশনে (External Weapon Stations) সর্বোচ্চ ৯ টন গোলাবারুদ বহন করতে পারে। এর অস্ত্রাগারে রয়েছে:
বিভিন্ন ধরনের আকাশ-থেকে-আকাশ ক্ষেপণাস্ত্র (Air-to-Air Missiles)।
উন্নত এয়ার-টু-সারফেস হামলা পরিচালনার জন্য স্টর্ম শ্যাডো (Storm Shadow), ব্রিমস্টোন (Brimstone) এবং মার্টে ইআর (Marte ER) মিসাইলের মতো অত্যাধুনিক গোলাবারুদ।
অপারেশনাল ইতিহাস ও ভূমিকা
উইকিপিডিয়ার তথ্যমতে, ইউরোফাইটার টাইফুন প্রথম যুদ্ধ অভিযানে অংশ নেয় ২০১১ সালে লিবিয়ায় সামরিক হস্তক্ষেপের সময়। সেখানে যুক্তরাজ্যের রয়্যাল এয়ার ফোর্স (RAF) এবং ইতালীয় বিমানবাহিনী এটিকে আকাশ নজরদারি (Air Policing) ও স্থল-আঘাত (Ground Strike) মিশনে সফলভাবে ব্যবহার করে। বর্তমানে এটি অনেক গ্রাহক দেশের আকাশ প্রতিরক্ষা (Air Defence) দায়িত্বেও প্রধান ভূমিকা পালন করছে। এই শক্তিশালী সামরিক 'প্ল্যাটফর্ম' (Platform) বাংলাদেশের প্রতিরক্ষা সক্ষমতাকে এক নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাবে বলে মনে করছেন সামরিক বিশ্লেষকরা।