পদ-পদবি না থাকলেও স্থানীয় বিএনপির সক্রিয় কর্মী তিনি। বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে গ্রেফতার আতঙ্কে বাড়িছাড়া ছিলেন কয়েকবার। কয়েক দিন আগে তার দোকানে চা পান করার সময় তারেক রহমানের দেশে না আসার প্রসঙ্গ উঠালে জিয়াউর রহমান বললেন, ‘তারেক রহমান আগামী বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী। উনি দ্রুতই দেশে আসবেন, দলের হাল ধরবেন, নির্বাচনি প্রচারণা শুরু করবেন। বিগত স্বৈরাচারী সরকারের সময়ে তাকে মামলা দিয়ে দেশে আসতে দেওয়া হয়নি।’
এক-এগারো সেনা সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় ১৮ মাস কারাভোগের পর ২০০৮ সালের ১১ সেপ্টেম্বর লন্ডনের উদ্দেশে ঢাকা ছেড়েছিলেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। গত বছরের ৫ আগস্ট শেখ হাসিনার পতনের পর তার স্বদেশ প্রত্যাবর্তন নিয়ে বিএনপির নেতারা নানা বক্তব্য দেন। কিন্তু তিনি ফিরতে পারেননি।
সর্বশেষ গত ২৩ নভেম্বর তার মা খালেদা জিয়া গুরুতর অসুস্থতা নিয়ে এভারকেয়ার হাসপাতালে ভর্তি হলে তারেক রহমানের দেশে ফেরা নিয়ে ব্যস্ত হয়ে ওঠে রাজনীতি। এই পরিপ্রেক্ষিতে তারেক রহমান নিজেই ফেসবুকে স্ট্যাটাসে জানান, ‘এমন সংকটকালে মায়ের স্নেহস্পর্শ পাওয়ার তীব্র আকাঙ্ক্ষা যেকোনও সন্তানের মতো আমারও রয়েছে। কিন্তু অন্য আর সবার মতো এটা বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে আমার একক সিদ্ধান্ত গ্রহণের সুযোগ অবারিত ও একক নিয়ন্ত্রণাধীন নয়। স্পর্শকাতর এই বিষয়টি বিস্তারিত বর্ণনার অবকাশও সীমিত।’
বিএনপির সমর্থকরাও তার ওপর ভরসা রাখছেন। তরুণ, প্রবীণ ও বিশেষ করে আগামী নির্বাচনের ভোটার হবেন— এমন সমর্থকরাও তারেক রহমানের দেশে ফেরাকে ‘রাজনৈতিক’ হিসেবেই বিবেচনা করছেন। কোনও কোনও কর্মীর অবশ্য মন খারাপ। বলছেন, তারেক রহমান না ফেরায় ভালো লাগছে না। এ কারণেই অনেকে তার দ্রুত ফেরা জরুরি বলে উল্লেখ করেছেন।
যশোরের টেংরামারি গ্রামের বিএনপি সমর্থক জিয়াউর রহমান বলছিলেন, ‘রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পরে তিনি আসতে চেয়েছিলেন, আসেননি। তিনি এলে নেতাকর্মীরা চাঙা হয়ে যাবেন। অনলাইনে দেশ ও দলের নেতৃত্ব দিলেও প্রতিটি নেতাকর্মী তিনি যে যে নির্দেশনা দেবেন—সে অনুযায়ী কাজ করবেন। যেমনটি তার নির্দেশে বিগত আন্দোলন সংগ্রামে ভূমিকা রেখেছিল।’
‘ফেরা নিয়ে ষড়যন্ত্র আছে, উড়িয়ে দেওয়া যায় না’ গুলশান থানা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক আজিজুল ইসলাম মিন্টু বলেন, ‘তারেক রহমান ১৮ কোটি মানুষের নেতা। আগামী দিনে তার দিকেই চেয়ে আছে দেশ। তবে তার বিরুদ্ধে এক ধরনের ষড়যন্ত্র হচ্ছে। না হয় মায়ের এমন কঠিন মুহূর্তে কোনও সন্তান পাশে না থেকে পারেন না। আমরা মনে করি, তিনি নিজেও দেশে আসার জন্য উদগ্রীব হয়ে আছেন।’
‘তার ফেরা নিয়ে এক ধরনের ষড়যন্ত্র আছে, এটিও উড়িয়ে দেওয়া যায় না। এক্ষেত্রে সরকারকেই বিষয়টি নিয়ে ভাবতে হবে। তার নিরাপত্তার বিষয়টি নিশ্চিত করতে হবে।’
রাজধানীর শেরেবাংলা নগর থানা বিএনপির সদস্য এ কে আজাদ বলেন, ‘তারেক রহমান একটি বিশেষ প্রেক্ষাপটে লন্ডনে গেছেন। এরপর ফ্যাসিস্ট সরকার তার বিরুদ্ধে একের পর এক মামলা দিয়েছে। তাকে দেশে আসতে দেয়নি। এ মুহূর্তে তার দেশে আসা জরুরি। বিশেষ করে দলীয় চেয়ারপারসন ও জাতীয় নির্বাচন সামনে রেখে তিনি যেকোনও কৌশলে ফিরবেন বলে আশা রাখি। কারণ তিনি না এলে দলীয় নেতাকর্মীরা আশাহত হতে পারেন। আমাদের বিশ্বাস তিনি দেশে আসার পূর্ণ প্রস্তুতি নিলে কোনও কিছুই বাধা হতে পারবে না।’ পল্টন থানা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক কামাল হোসেনের মন্তব্য, ‘তারেক রহমান নিশ্চয়ই দেশে আসবেন। তবে এখনও কেন আসতে পারছেন না, তা তার জন্য বলা কঠিন।’
‘তারেকের না ফেরায় ভালো লাগছে না’ জাকিরের বিএনপির সমর্থক বরিশালের বানারীপাড়া উপজেলা সদরের বাসিন্দা জাকির হোসেন বলেন, ‘তারেক রহমানের দেশে না ফেরার বিষয়টি ভালো লাগছে না। সুষ্ঠু নির্বাচনের মাধ্যমে সরকার গঠনের লক্ষ্যে তার দেশে আসা প্রয়োজন।’
উজিরপুর উপজেলার ওটরা ইউনিয়নের বাসিন্দা ও বিএনপির সমর্থক জামাল উদ্দিন বলেন,‘ তারেক রহমান নিরাপত্তার কারণে দেশে আসছেন না। তবে তার দেশে আসা খুব জরুরি। বিশেষ করে আগামী নির্বাচনের আগে দেশে আসলে তরুণ ভোটারের সঙ্গে সঙ্গে যারা তারেক রহমানের বাবা-মাকে ভালোবাসেন, তাদের ভোট বিএনপির পক্ষে যাবে। তা না হলে নির্বাচনে এর প্রভাব পড়তে পারে।’
তরুণ সমর্থক হেলাল উদ্দিন বলেন, ‘তারেক রহমানের স্লোগান ‘তরুণের প্রথম ভোট ধানের শীষের পক্ষে হোক’। এ স্লোগান বাস্তবায়ন করতে হলে নির্বাচনের আগে তাকে অবশ্যই দেশে আসতে হবে। তা না হলে তরুণদের ভোট হারানোর শঙ্কার রয়েছে বলে দাবি করেন এ তরুণ সমর্থক।’
নিরাপত্তার কারণে দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান দেশে আসতে পারছেন না বলে মনে করেন বরিশালের প্রবীণ রাজনীতিবিদ এবায়েদুল হক চান ও তরুণ সমর্থক জসিম উদ্দিন। জসিম উদ্দিনের মতে, তারেক রহমান নিরাপত্তার কারণে দেশে আসছেন না। দল এবং বাইরের শত্রু দ্বারা তিনি আক্রান্ত হতে পারেন। আর সরকারের নিরাপত্তায়ও তিনি বিশ্বাস করছেন না। তাকে মাইনাস করার ষড়যন্ত্র চলছে বলে তিনি মনে করছেন। তবে সব ষড়যন্ত্রকে পেছনে ফেলে তার দেশে আসা প্রয়োজন বলে মনে করেন এ সমর্থক।
এবায়েদুল হক চান মনে করেন, বর্তমান সরকার তার নিরাপত্তা নিশ্চিত করার বিষয়টি পরিষ্কার করলে তারেক রহমান দ্রুত সময়ের মধ্যে দেশে ফিরে আসবেন। আর তার দেশে আসার অপেক্ষায় কোটি কোটি মানুষ। দলীয় নেতাকর্মীরা উজ্জীবিত আছেন। তারা নির্বাচনের জন্য সহযোগী হিসেবে কাজ করবেন। তবে নির্বাচনের পূর্বে তার দেশে আসা প্রয়োজন বলে মনে করেন এই প্রবীণ নেতা।
বরিশাল দক্ষিণ জেলা বিএনপির সদস্য সচিব আবুল কালাম শাহিন বলেন, ‘তারেক রহমান দেশে আসার বিষয়টি নিয়ে শুধু আমরা চিন্তা করি তা না, তারেক রহমান নিজেও দেশে আসার চিন্তা করছেন। এখন পরিবেশ পরিস্থিতিসহ সবকিছ্রু বিবেচনা করবেন দলের হাইকমান্ড এবং তারেক রহমান নিজে। এটা তাদের উপরই নির্ভর করে।’
মহানগর বিএনপির ১ নম্বর যুগ্ম আহ্বায়ক আফরোজা খানম নাসরিন বলেন, ‘আমাদের অপেক্ষা ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের দেশে ফেরার জন্য। তিনি দেশে ফিরলে রাজনৈতিক যেটুকু অস্থিরতা রয়েছে তা শূন্যের কোঠায় চলে আসবে। নেতাকর্মী ও সমর্থকরা উজ্জীবিত হয়ে দলের জন্য এবং দেশের মানুষের জন্য কাজ করতে পারবেন।’