• দেশজুড়ে
  • হাম আতঙ্কে কাঁপছে চট্টগ্রাম: শেষ ভরসা টিকাদান

হাম আতঙ্কে কাঁপছে চট্টগ্রাম: শেষ ভরসা টিকাদান

দেশজুড়ে ১ মিনিট পড়া
হাম আতঙ্কে কাঁপছে চট্টগ্রাম: শেষ ভরসা টিকাদান

মো.মোক্তার হোসেন বাবু,চট্টগ্রাম ব্যুরো:

চট্টগ্রাম নগরের বহদ্দারহাট এলাকার বাসিন্দা হাজেরা আক্তার ও আব্দুর রশিদের সংসারে আনন্দের কেন্দ্রবিন্দু তাদের ১৩ মাস বয়সী যমজ কন্যা দিবা ও নিশি। কিন্তু সেই আনন্দের মাঝেই এখন ভর করেছে অজানা শঙ্কা। চারদিকে হামের প্রকোপ, শিশু মৃত্যুর খবর। সব মিলিয়ে আতঙ্কে দিন কাটছে এই দম্পতির।

যদিও নিয়ম অনুযায়ী নয় মাস বয়সে হাম-রুবেলার টিকা দেওয়া হয়েছে তাদের সন্তানদের, তবুও নতুন করে শুরু হতে যাওয়া টিকাদান কর্মসূচি নিয়ে তাদের মনে দানা বাঁধছে নানা প্রশ্ন। টিকা দেবেন কি দেবেন নাÑএই দোটানায় দিন কাটছে তাদের। টিকা না দিলে যদি ঝুঁকি থাকে, আবার দিলে কোনো পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হলে সেই আশঙ্কাও কম নয়।

এই উদ্বেগ শুধু একটি পরিবারের নয়, নগরজুড়ে হাজারো অভিভাবকের মনেই একই দুশ্চিন্তা। অনেকেই করোনাকালের টিকা গ্রহণের পর বিভিন্ন পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরে বলছেন, শিশুদের ক্ষেত্রে এমন কিছু হলে তা সামাল দেওয়া কঠিন হবে।

স্কুল শিক্ষিকা পলি বিশ্বাস ও তার স্বামী বিমল বিশ্বাসও রয়েছেন একই দোটানায়। তাদের এক সন্তানের বয়স সাত মাস আট দিন, আরেকজনের সাড়ে তিন বছর। বড় সন্তানকে নিয়মিত টিকা দেওয়া হলেও ছোটটির এখনো নির্ধারিত সময় হয়নি। আসন্ন ক্যাম্পেইনে ছয় মাস থেকে পাঁচ বছর বয়সী শিশুদের টিকা দেওয়ার ঘোষণায় তারা দ্বিধায় পড়েছেনÑএকজনকে দেবেন, নাকি দুজনকেই?

পলি বিশ্বাস বলেন, “করোনার সময় টিকা নেওয়ার পর আমরা নানা ধরনের সমস্যায় পড়েছিলাম। এখন যদি শিশুদের ক্ষেত্রেও তেমন কিছু হয়, সেটা খুবই ভয়ঙ্কর হবে। তাই কী করবো বুঝতে পারছি না।”

তবে এমন আশঙ্কা উড়িয়ে দিয়ে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ভয় নয়, সচেতনতাই এখন সবচেয়ে জরুরি। তাদের মতে, এই হাম-রুবেলা টিকা সম্পূর্ণ নিরাপদ এবং নির্দিষ্ট বয়সসীমার শিশুদের জন্য উপযোগী করেই তৈরি করা হয়েছে।

স্বাস্থ্য সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তায় ইউনিসেফের মাধ্যমে বাংলাদেশে ২ কোটি ১৯ লাখ ডোজ হাম-রুবেলার টিকা সরবরাহ করা হয়েছে। এই কর্মসূচির আওতায় পাঁচ বছরের কম বয়সী প্রায় ১ কোটি ২০ লাখ শিশুকে টিকা দেওয়ার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।

চট্টগ্রাম জেলা সিভিল সার্জন ডা. মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী বলেন, “এটি মূলত বুস্টার ডোজ হিসেবে দেওয়া হচ্ছে। যারা আগে টিকা নেয়নি, তারাও নিতে পারবে; আবার যারা এক বা দুই ডোজ নিয়েছে, তারাও এই টিকা নিতে পারবে। এতে কোনো ক্ষতির আশঙ্কা নেই, বরং হামের সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে এটি অত্যন্ত কার্যকর হবে।”

তিনি আরও জানান, টিকা নেওয়ার পর সামান্য জ্বর বা শরীরে লালচে ভাব দেখা দিতে পারে, যা স্বাভাবিক এবং কয়েক দিনের মধ্যেই সেরে যায়। তাই অভিভাবকদের অযথা আতঙ্কিত না হয়ে সময়মতো শিশুদের টিকা দেওয়ার আহŸান জানান তিনি।

এদিকে, অভিভাবকদের আরেকটি বড় উদ্বেগ হলো টিকাকেন্দ্রে গিয়ে সংক্রমণের ঝুঁকি। নজরুল ইসলাম নামের এক অভিভাবক বলেন, “যদি কেউ অসুস্থ শিশু নিয়ে আসে, তাহলে অন্য সুস্থ শিশুরা ঝুঁকিতে পড়বে না তো?”

এ বিষয়ে স্বাস্থ্য বিভাগ বলছে, জ্বর বা অন্য কোনো অসুস্থতায় ভোগা শিশুদের আপাতত টিকা না দেওয়ার নির্দেশনা রয়েছে। সুস্থ হওয়ার পরই টিকা নিতে হবে। পাশাপাশি, হামে আক্রান্ত ব্যক্তির সংস্পর্শে আসার ৭২ ঘণ্টার মধ্যে টিকা নিলে সংক্রমণের ঝুঁকি অনেকটাই কমে যায়। প্রয়োজনে চিকিৎসকের পরামর্শে ‘ইমিউনোগেøাবিউলিন’ দেওয়া যেতে পারে।

চিকিৎসকরা আরও পরামর্শ দিচ্ছেন, আক্রান্ত শিশুকে অন্তত ৪–৫ দিন আলাদা রাখতে হবে, যাতে সংক্রমণ না ছড়ায়। পাশাপাশি ভিটামিন ‘এ’ ক্যাপসুল, পর্যাপ্ত বিশ্রাম এবং পুষ্টিকর খাবার শিশুর সুস্থতায় গুরুত্বপূর্ণ ভ‚মিকা রাখে।

আসন্ন টিকাদান কর্মসূচিকে ঘিরে অনলাইন নিবন্ধনের ব্যবস্থাও চালু করা হয়েছে। ৬ মাস থেকে ৫ বছরের কম বয়সী শিশুদের জন্য াধীবঢ়র.মড়া.নফ ওয়েবসাইটে জন্মনিবন্ধন দিয়ে নিবন্ধন করা যাবে। তবে নিবন্ধন ছাড়া টিকা নেওয়ার সুযোগও থাকছে।

আগামী ২০ এপ্রিল থেকে উপজেলা পর্যায়ে ১০ মে পর্যন্ত এবং সিটি কর্পোরেশন এলাকায় ২০ মে পর্যন্ত এই টিকাদান কার্যক্রম চলবে।

সব মিলিয়ে, হামের বাড়তে থাকা সংক্রমণের মধ্যে একদিকে যেমন উদ্বেগ বাড়ছে, অন্যদিকে টিকাদান কর্মসূচি হয়ে উঠছে আশার আলো। বিশেষজ্ঞদের মতে, ভয় নয়Ñসঠিক তথ্য ও সচেতন সিদ্ধান্তই পারে শিশুদের সুরক্ষিত রাখতে