আন্তর্জাতিক মানবাধিকার দিবসে বিগত দেড় দশকের শাসনামল এবং ২০২৪ সালের ঐতিহাসিক গণঅভ্যুত্থানের প্রেক্ষাপটে এক আবেগঘন ও তাৎপর্যপূর্ণ বার্তা দিয়েছেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। তিনি দাবি করেছেন, চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানে সবচেয়ে বেশি রক্ত ঝরেছে বিএনপির নেতাকর্মীদেরই। একইসঙ্গে তিনি স্পষ্ট করেছেন, তার দল প্রতিহিংসা নয়, বরং পুনর্মিলন ও আইনের শাসনে বিশ্বাসী এক নতুন বাংলাদেশ গড়তে চায়।
বুধবার (১০ ডিসেম্বর) নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে দেওয়া এক দীর্ঘ স্ট্যাটাসে তিনি দেশের মানবাধিকার পরিস্থিতি, বিগত দিনের নির্যাতন এবং আগামীর রাজনৈতিক দর্শন নিয়ে বিস্তারিত আলোকপাত করেন।
শহীদের রক্ত ও ত্যাগের খতিয়ান
তারেক রহমান তার বার্তায় উল্লেখ করেন, গত ১৬ বছর বাংলাদেশ যেন একটি ‘কালো মেঘের’ নিচে চাপা পড়েছিল। এই দীর্ঘ সময়ে বিরোধী মত দমনে যে ভয়াবহ ‘Human Rights Violation’ বা মানবাধিকার লঙ্ঘন হয়েছে, তার প্রধান ভুক্তভোগী ছিল বিএনপি।
তিনি বলেন, “বিচারবহির্ভূত হত্যা (Extrajudicial Killing), গুম (Enforced Disappearance), হেফাজতে মৃত্যু এবং মিথ্যা মামলা—সব জায়গায় বিএনপির নেতা-কর্মীরাই সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত। ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানেও সবচেয়ে বেশি রক্ত ঝরেছে বিএনপির ঘরেই।”
রাতের আঁধারে দরজায় কড়া নাড়া, বিনা অপরাধে গ্রেপ্তার এবং প্রিয়জনদের আর কখনো ফিরে না আসার যে সংস্কৃতি তৈরি হয়েছিল, তা বিএনপির নেতাকর্মীদের নিত্যদিনের সঙ্গী ছিল বলে তিনি মন্তব্য করেন। তবে তিনি এও স্মরণ করিয়ে দেন যে, এই যন্ত্রণার অংশীদার শুধু বিএনপি ছিল না; ছাত্র, সাংবাদিক, লেখক এবং সাধারণ মানুষও এই ‘Authoritarian Regime’ বা কর্তৃত্ববাদী শাসনের শিকার হয়েছেন।
‘কণ্ঠরোধ’ ও ব্যক্তিগত সংগ্রাম
বিগত সরকারের সময় বাকস্বাধীনতা হরণের প্রসঙ্গ টেনে তারেক রহমান বলেন, ২০১৫ সাল থেকে তার কথা বলার মৌলিক অধিকার বা ‘Freedom of Speech’ সম্পূর্ণভাবে কেড়ে নেওয়া হয়েছিল। দেশের গণমাধ্যমে তার বক্তব্য প্রচারে নিষেধাজ্ঞা জারি ছিল।
তিনি লেখেন, “চাপিয়ে দেওয়া নীরবতার মধ্যেও আমি অধিকার, গণতন্ত্র আর মানুষের ন্যায্য দাবির পক্ষে লড়াই চালিয়ে গেছি। কারণ, সত্যের স্পিরিটকে (Spirit of Truth) আদেশ দিয়ে থামানো যায় না।”
খালেদা জিয়া: এক অবিচল প্রতীক
সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার ওপর দিয়ে বয়ে যাওয়া ঝড়ের কথাও গভীর আবেগের সাথে তুলে ধরেন তারেক রহমান। তিনি জানান, দেশনেত্রী খালেদা জিয়া ছিলেন এই অন্ধকার সময়ে ধৈর্য ও প্রতিরোধের সবচেয়ে বড় প্রতীক।
মায়ের ত্যাগের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, “তিনি নিজ হাতে সহ্য করেছেন তাঁর ছেলেকে জেলে নেওয়া ও নির্যাতনের মানসিক যন্ত্রণা। তাঁর আরেক ছেলেকে (আরাফাত রহমান কোকো) আমরা চিরতরে হারিয়েছি। বাংলাদেশের হাজারো পরিবারের মতো আমাদের পরিবারও ছিল লক্ষ্যবস্তু।” এতকিছুর পরেও খালেদা জিয়া গণতান্ত্রিক আদর্শ থেকে বিচ্যুত হননি বলে উল্লেখ করেন তিনি।
প্রতিশোধ নয়, আগামীর বাংলাদেশ
ভবিষ্যৎ রাজনীতির রূপরেখা দিতে গিয়ে তারেক রহমান অত্যন্ত পরিপক্ক ও রাষ্ট্রনায়কোচিত দৃষ্টিভঙ্গি প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, কষ্ট মানুষকে সবসময় তিক্ত করে না, বরং মহান করে তোলে। বিএনপি সেই শিক্ষা থেকেই প্রতিশোধের রাজনীতি (Politics of Revenge) প্রত্যাখ্যান করছে।
তার ভাষায়, “আজ বাংলাদেশের প্রয়োজন রাজনীতির চেয়েও বড় কিছু—একটি ঐক্যবদ্ধ দেশ। আমরা এমন একটি রাষ্ট্র চাই যেখানে ভিন্ন মতের কারণে কাউকে গুম হতে হবে না। বিএনপি আজ সমাধানের পথে বিশ্বাসী। আমরা প্রতিশ্রুতি দিচ্ছি, কোনো বাংলাদেশিকে আর রাষ্ট্রের ভয়ে বাঁচতে হবে না—তা সে সরকারের সমর্থক হোক বা বিরোধী।”
শহীদের স্মৃতি ও মানবাধিকারের অঙ্গীকার
মানবাধিকার দিবসের তাৎপর্য তুলে ধরে তারেক রহমান আবরার ফাহাদ, মুশতাক আহমেদ, ইলিয়াস আলী, সাজেদুল ইসলাম সুমন এবং সাংবাদিক দম্পতি সাগর-রুনির মতো নিহত ও গুম হওয়া ব্যক্তিদের স্মরণ করেন। তিনি বলেন, ১০ ডিসেম্বর আমাদের মনে করিয়ে দেয়—মানবাধিকার মানুষের বেঁচে থাকার মৌলিক শর্ত।
পরিশেষে তিনি একটি ন্যায়ভিত্তিক সমাজ গড়ার প্রত্যয় ব্যক্ত করে বলেন, বিএনপি মারাত্মক ক্ষতি সহ্য করেও ভেঙে পড়েনি। বরং সত্য, জবাবদিহিতা (Accountability) এবং আইনের শাসনের ওপর বিশ্বাস রেখে দলটি আরও সুদৃঢ় হয়েছে।