দীর্ঘ ২২ বছরের আক্ষেপ ঘুচিয়ে ভারতের বিপক্ষে ঐতিহাসিক জয়ের স্বীকৃতি অবশেষে বুঝে পেল বাংলাদেশ জাতীয় ফুটবল দল। গত ১৮ নভেম্বর ভারতের বিপক্ষে সেই অবিস্মরণীয় জয়ের পরপরই ঘোষিত ২ কোটি টাকার অর্থপুরস্কার আজ আনুষ্ঠানিকভাবে দলের হাতে তুলে দেওয়া হয়েছে। সদ্য পদত্যাগ করা যুব ও ক্রীড়া উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়ার প্রতিশ্রুত এই অর্থ মঙ্গলবার জাতীয় ক্রীড়া পরিষদের পক্ষ থেকে হস্তান্তর করা হয়। এর মধ্য দিয়ে লাল-সবুজের ফুটবলে যুক্ত হলো এক নতুন অধ্যায়, যা ফুটবলারদের মনোবল বৃদ্ধিতে বড় ভূমিকা রাখবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
প্রতিশ্রুতির বাস্তবায়ন ও চেক হস্তান্তর
ঐতিহাসিক সেই জয়ের পরই দলের জন্য বড় অঙ্কের বোনাস ঘোষণা করেছিলেন তৎকালীন ক্রীড়া উপদেষ্টা। সেই ঘোষণার বাস্তুবায়ন হিসেবে আজ জাতীয় ক্রীড়া পরিষদ (NSC) থেকে চেক ইস্যু করা হয়। জাতীয় দলের ম্যানেজার আমের খান দলের পক্ষ থেকে এই চেক গ্রহণ করেন। বাফুফের পক্ষ থেকে মোট ৪০ জন সদস্যের একটি তালিকা ক্রীড়া পরিষদে জমা দেওয়া হলেও, চূড়ান্তভাবে চেক ইস্যু করা হয়েছে ৩০ জনের নামে।
পুরস্কারের বণ্টন ও ম্যানেজমেন্টের সিদ্ধান্ত
ক্রীড়া পরিষদের চূড়ান্ত অনুমোদন অনুযায়ী, ভারতজয়ী স্কোয়াডের ২৩ জন ফুটবলার প্রত্যেকে ৭ লাখ টাকা করে পেয়েছেন। খেলোয়াড়দের পাশাপাশি কোচিং স্টাফ ও টিম ম্যানেজমেন্টের ৭ জন সদস্যকেও পুরস্কৃত করা হয়েছে। তবে বাফুফের পাঠানো তালিকা থেকে বাদ পড়েছেন দলের গুরুত্বপূর্ণ সাপোর্ট স্টাফদের একাংশ। এর মধ্যে মিডিয়া ম্যানেজার, ফিজিও, দলের ডাক্তার এবং টিম অ্যাটেন্ডেন্টদের নাম চূড়ান্ত পুরস্কারের তালিকায় রাখা হয়নি। এই ‘সিলেক্টিভ’ বিতরণ প্রক্রিয়া নিয়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিলেও, খেলোয়াড়দের হাতে দ্রুততম সময়ে প্রতিশ্রুত অর্থ পৌঁছে দেওয়াকে ইতিবাচক হিসেবেই দেখছে ফুটবল অঙ্গন।
২২ বছরের আক্ষেপ ঘুচানো সেই মহাকাব্য
ভারতের বিপক্ষে বাংলাদেশের এই জয়টি ছিল কেবল একটি ম্যাচের ফলাফল নয়, বরং দীর্ঘ দুই দশকের হতাশা মোচনের গল্প। পরিসংখ্যানে দেখা যায়, গত ২২ বছর ধরে প্রতিবেশী দেশটির বিপক্ষে জয়ের দেখা পাচ্ছিল না বাংলাদেশ। মাঝের ১০টি ম্যাচের মধ্যে ৬টিতে ড্র এবং ৪টিতে হারের স্বাদ নিতে হয়েছিল। সর্বশেষ ২৫ মার্চ এশিয়ান কাপ বাছাইয়ের ম্যাচে শিলংয়ে গোলশূন্য ড্র করে ফেরার পর থেকেই দলের মধ্যে জয়ের ক্ষুধা তীব্র হয়েছিল।
অবশেষে সেই অপেক্ষার অবসান ঘটে গত ১৮ নভেম্বর। ঘরের মাঠে ম্যাচের শুরু থেকেই দুর্দান্ত ‘কাউন্টার অ্যাটাক’ নির্ভর ফুটবল খেলতে থাকে বাংলাদেশ। ম্যাচের ১১তম মিনিটে রাকিব হোসেন ও শেখ মোরসালিনের বোঝাপড়ায় আসে সেই কাঙ্ক্ষিত মুহূর্ত। বাঁ প্রান্ত থেকে রাকিবের নিখুঁত পাসে ভারতের গোলকিপারের চোখের সামনে দিয়ে বল জালে জড়িয়ে দেন তরুণ তুর্কি শেখ মোরসালিন। ১-০ গোলের সেই লিডই শেষ পর্যন্ত ধরে রাখে বাংলাদেশ। যদিও গোলদাতার খাতায় মোরসালিনের নাম, তথাপি মাঠে পুরো দলের নেতৃত্ব ও মাঝমাঠের নিয়ন্ত্রণে হামজা চৌধুরীর ভূমিকা ছিল অনবদ্য।
র্যাঙ্কিংয়ে বড় লাফ ও আগামীর সম্ভাবনা
ভারতবধের এই জয় কেবল আর্থিক পুরস্কারই এনে দেয়নি, আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও বাংলাদেশের অবস্থানকে সুদৃঢ় করেছে। এই জয়ের ফলে গত ৯ বছরের মধ্যে ফিফা র্যাঙ্কিংয়ে (FIFA Ranking) নিজেদের সেরা অবস্থানে উঠে এসেছে ‘হামজা বাহিনী’। ৯১১.১৯ ‘রেটিং পয়েন্ট’ নিয়ে বাংলাদেশ এখন অবস্থান করছে ১৮০ নম্বরে।
এর আগে ২০১৬ সালের মে মাসে বাংলাদেশ ১৭৮ নম্বরে অবস্থান করছিল, তখন রেটিং পয়েন্ট ছিল ৮৭। এরপর ২০১৭ সালের শেষের দিকে ১৯৭ নম্বরে নেমে গিয়ে নিজেদের ইতিহাসের সবচেয়ে বাজে সময় পার করেছিল লাল-সবুজের প্রতিনিধিরা। ২০১৯ সালের এপ্রিলে নব্বইয়ের ঘর থেকে বের হওয়ার পর, বর্তমানের এই ১৮০তম অবস্থান ফুটবলোন্নতির গ্রাফে একটি ইতিবাচক সংকেত। ফুটবল বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এই জয় এবং তৎপরবর্তী রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি দলের আত্মবিশ্বাসকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাবে।