টানা কয়েক বছর ধরে চলা রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের মধ্যেই এবার ইউক্রেনের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে বড়সড় ঝাঁকুনি দিলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প। যুদ্ধের অজুহাতে কিয়েভ নির্বাচন এড়িয়ে যাচ্ছে— এমন বিস্ফোরক অভিযোগ তুলে অবিলম্বে ভোটের দাবি জানিয়েছেন তিনি। ট্রাম্পের এই ‘চাপ’-এর মুখে অবশ্য পিছু হটেননি ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি। বরং তিনি বল ঠেলে দিয়েছেন পশ্চিমাদের কোর্টেই। জেলেনস্কি সাফ জানিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপ যদি ভোটের পূর্ণ ‘সিকিউরিটি গ্যারান্টি’ দিতে পারে, তবে আগামী ৬০ থেকে ৯০ দিনের মধ্যেই জাতীয় নির্বাচন আয়োজনে প্রস্তুত তাঁর সরকার।
গণতন্ত্র নিয়ে ট্রাম্পের প্রশ্ন ও কিয়েভের ওপর চাপ
চলমান সংঘাতের মধ্যেই তুর্কি সংবাদমাধ্যম টিআরটি ওয়ার্ল্ড ও পলিটিকো-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ইউক্রেনের বর্তমান শাসনব্যবস্থা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। গত মঙ্গলবার (৯ ডিসেম্বর) তিনি বলেন, “ইউক্রেন আদতে সত্যিকারের ‘ডেমোক্রেসি’ বা গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে।” ট্রাম্পের অভিযোগ, ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে চলা ‘মার্শাল ল’ বা জরুরি অবস্থার দোহাই দিয়ে কিয়েভ নির্বাচন প্রক্রিয়া স্থগিত রেখেছে। তাঁর মতে, যুদ্ধকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে নির্বাচন এড়ানো গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের পরিপন্থী।
উল্লেখ্য, ইউক্রেনের সংবিধান ও আইন অনুযায়ী যুদ্ধ চলাকালীন জাতীয় নির্বাচন আয়োজন নিষিদ্ধ। ২০২৪ সালের মার্চে দেশটিতে প্রেসিডেন্ট নির্বাচন হওয়ার কথা থাকলেও রুশ আগ্রাসনের কারণে তা পিছিয়ে যায়। তবে ট্রাম্পের এই সাম্প্রতিক মন্তব্য কিয়েভের ওপর নতুন করে ‘ডিপ্লোম্যাটিক প্রেশার’ বা কূটনৈতিক চাপ সৃষ্টি করেছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
জেলেনস্কির শর্ত: আগে নিরাপত্তা, পরে ভোট
ট্রাম্পের মন্তব্যের প্রতিক্রিয়ায় অত্যন্ত কৌশলী অবস্থান নিয়েছেন জেলেনস্কি। তিনি নির্বাচন আয়োজনের বিপক্ষে নন, তবে তার জন্য ‘লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড’ ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করাকেই অগ্রাধিকার দিচ্ছেন। জেলেনস্কি স্পষ্ট করেছেন, “যুদ্ধবিধ্বস্ত একটি দেশে নির্বাচন আয়োজন মুখের কথা নয়। তবে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় মিত্ররা যদি ভোটার এবং পোলিং স্টেশনগুলোর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারে, তবে আমরা তিন মাসের মধ্যেই নির্বাচনের জন্য প্রস্তুত।”
আইনি জটিলতা নিরসনে জেলেনস্কি ইতিমধ্যে ইউক্রেনের পার্লামেন্ট ‘ভারখোভনা রাদা’-র (Verkhovna Rada) সদস্যদের আইন সংশোধনের নির্দেশ দিয়েছেন। তবে তিনি জোর দিয়ে বলেছেন, মিসাইল হামলার আতঙ্ক মাথায় নিয়ে জনগণ ভোট দিতে আসবে না, তাই সবার আগে প্রয়োজন নিরাপদ পরিবেশ।
যুদ্ধক্ষেত্রের হালহকিকত: দোনেৎস্কে রুশ অগ্রগমন
রাজনীতির মাঠ যখন উত্তপ্ত, তখন রণক্ষেত্রের পরিস্থিতিও ক্রমশ ভয়াবহ হয়ে উঠছে। বুধবার (১০ ডিসেম্বর) রুশ প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় দাবি করেছে, তাদের সেনাবাহিনী ইউক্রেনের আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ জনবসতি দখল করেছে। বিশেষ করে দোনেৎস্ক ওব্লাস্টের কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ শহর ‘পোকরভস্ক’ (Pokrovsk)-এ রুশ বাহিনীর মুহুর্মুহু হামলা অব্যাহত রয়েছে।
কিয়েভ স্বীকার করেছে যে, পোকরভস্কের পরিস্থিতি বর্তমানে ইউক্রেনীয় বাহিনীর অনুকূলে নেই, যদিও শহরের একটি অংশের নিয়ন্ত্রণ এখনও তাদের হাতে রয়েছে। অন্যদিকে, জেলেনস্কি বাহিনীর দাবি, তারা লিমান ও স্লোভিয়ানস্কের মতো গুরুত্বপূর্ণ ফ্রন্টলাইনগুলোতে রাশিয়ার বড়সড় হামলা সফলভাবে প্রতিহত বা ‘কাউন্টার’ করতে সক্ষম হয়েছে।
আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া ও রাশিয়ার অবস্থান
ইউক্রেনে নির্বাচনের এই ডামাডোলে বেশ উল্লসিত মস্কো। ক্রেমলিনের মুখপাত্র দিমিত্রি পেসকভ ট্রাম্পের দাবি এবং জেলেনস্কির প্রতিক্রিয়াকে স্বাগত জানিয়ে বলেছেন, ভ্লাদিমির পুতিনও দীর্ঘদিন ধরে ইউক্রেনে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার কথা বলে আসছেন।
অন্যদিকে, ইউরোপীয় নেতারা পরিস্থিতি সামাল দিতে কূটনৈতিক তৎপরতা জোরদার করেছেন। জার্মান চ্যান্সেলর ফ্রিডরিশ ম্যার্ৎস জানিয়েছেন, বার্লিন এই সংকট সমাধানে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রীও ইউক্রেনের প্রতি ইউরোপের অটুট সমর্থনের কথা পুনর্ব্যক্ত করেছেন। তবে যুদ্ধবিরতি বা শান্তি আলোচনা ছাড়াই নির্বাচনের আয়োজন কতটা ফলপ্রসূ হবে, তা নিয়ে সংশয় রয়েই গেছে আন্তর্জাতিক মহলে।