ইসরায়েলি বোমায় ক্ষতবিক্ষত গাজাবাসীর জন্য এ যেন ‘মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা’। একদিকে মাথার ওপর নেই শক্ত ছাদ, অন্যদিকে তীব্র শীত আর খাবারের অভাব—এরই মধ্যে ‘স্টর্ম বায়রন’-এর (Storm Byron) তাণ্ডব গাজার মানবিক পরিস্থিতিকে এক চরম বিপর্যয়ের মুখে ঠেলে দিয়েছে। গাজার স্বরাষ্ট্র ও জাতীয় নিরাপত্তা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, যুদ্ধবিধ্বস্ত এই জনপদে ঝড়টি আঘাত হানার পর পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেছে।
শুক্রবার (১২ ডিসেম্বর) গাজা উপত্যকাজুড়ে বয়ে যাওয়া এই ঝড়ে তছনছ হয়ে গেছে বাস্তুচ্যুত মানুষের শেষ আশ্রয়স্থলটুকুও। হাজার হাজার পরিবার এখন খোলা আকাশের নিচে, যাদের কাছে নেই পর্যাপ্ত শীতবস্ত্র (Winter Clothing) বা বেঁচে থাকার মতো ন্যূনতম জ্বালানি।
ধ্বংসস্তূপে প্রকৃতির আঘাত: মৃত্যুর মিছিল
গাজার স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তথ্যমতে, শুক্রবার ভোরে উত্তর গাজার বির আন-নাজা এলাকায় ঝড়ের তোড়ে বাস্তুচ্যুতদের আশ্রয় দেওয়া একটি বিধ্বস্ত বাড়ির অবশিষ্টাংশ ধসে পড়ে। এতে ঘটনাস্থলেই পাঁচজনের মৃত্যু হয়। একইদিন ভোরে গাজা সিটির রিমাল এলাকায় একটি দেয়াল ধসে পড়ে পাশের তাবুর ওপর, এতে প্রাণ হারান আরও দুজন।
এর আগের দিন শাতি শরণার্থী শিবিরে (Refugee Camp) একটি নড়বড়ে কাঠামো ধসে একজনের মৃত্যু হয়। অন্যদিকে, দক্ষিণ গাজার আল-মাওয়াসি এলাকায় হাড়কাঁপানো শীতে জমে গিয়ে মৃত্যু হয়েছে এক শিশুর। সব মিলিয়ে ঝড়ের প্রভাবে মৃতের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১৪ জনে।
তাঁবুর শহর এখন ‘মৃত্যুফাঁদ’
দক্ষিণ গাজার আল-মাওয়াসি থেকে আল জাজিরার প্রতিবেদক ইব্রাহিম আল-খালিলি জানিয়েছেন, ঝড়টি গাজার আশ্রয়কেন্দ্রগুলোকে আক্ষরিক অর্থেই ‘মৃত্যুফাঁদে’ (Death Trap) পরিণত করেছে। তিনি সতর্ক করে বলেন, “এখনও ভারী বৃষ্টি, বন্যা এবং শিলাবৃষ্টির প্রবল আশঙ্কা রয়েছে।”
পরিসংখ্যান বলছে, ঝড়ের কারণে বর্তমানে ৭৬১টি আশ্রয়কেন্দ্রে থাকা প্রায় ৮ লাখ ৫০ হাজার মানুষ সরাসরি মৃত্যুঝুঁকিতে রয়েছেন। জাতিসংঘের (UN) হিসাব অনুযায়ী, প্রায় ৮ লাখ মানুষ এখন চরম অসহায় অবস্থায় দিন কাটাচ্ছেন। ইসরায়েলি অবরোধের কারণে এই মুহূর্তে দুর্যোগ মোকাবিলার মতো কোনো অবকাঠামো বা ‘লজিস্টিক সাপোর্ট’ গাজায় অবশিষ্ট নেই। যুদ্ধ, অবরোধ আর প্রকৃতির এই ত্রিমুখী আক্রমণে গাজায় এখন নজিরবিহীন Humanitarian Crisis বা মানবিক বিপর্যয় চলছে।
দায়ভার ও আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক সমীকরণ
গাজার এই চরম দুদিনে আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও শুরু হয়েছে নতুন আলোচনা। লন্ডনে জাতিসংঘের বিশেষ প্রতিনিধি ফ্রান্সেসকা আলবানিজ এক কড়া বার্তায় বলেছেন, গাজা পুনর্গঠনের (Reconstruction) বিশাল আর্থিক দায়ভার শুধু ইসরায়েলকে বহন করলেই চলবে না। যেসব দেশ তেল আবিবকে নিরবচ্ছিন্নভাবে অস্ত্র সরবরাহ করেছে—যার মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র, জার্মানি, ইতালি ও যুক্তরাজ্য অন্যতম—তাদেরও এই খরচের অংশ বহন করতে হবে।
অন্যদিকে, ভূ-রাজনীতির মাঠেও নতুন দাবার চাল চালছে যুক্তরাষ্ট্র। মার্কিন কর্মকর্তাদের বরাতে রয়টার্স জানিয়েছে, আগামী মাসেই গাজায় একটি আন্তর্জাতিক ‘স্ট্যাবিলিটি ফোর্স’ (International Stability Force) বা স্থিতিশীলতা বাহিনী মোতায়েনের পরিকল্পনা চূড়ান্ত করছে ওয়াশিংটন।
জাতিসংঘ অনুমোদিত এই বাহিনীর নেতৃত্বে একজন মার্কিন ‘টু-স্টার জেনারেল’ থাকার প্রস্তাব করা হয়েছে। জানা গেছে, এই বাহিনী সরাসরি হামাসের বিরুদ্ধে কোনো ‘কমব্যাট’ বা আক্রমণে যাবে না। বরং তাদের মূল লক্ষ্য হবে যুদ্ধ-পরবর্তী গাজায় শান্তি ও স্থিতিশীলতা রক্ষার দ্বিতীয় ধাপটি বাস্তবায়ন করা। হোয়াইট হাউসের দাবি, টেকসই শান্তি (Sustainable Peace) নিশ্চিতের জন্য এই ‘সাইলেন্ট প্ল্যান’ বা নীরব পরিকল্পনা ইতিমধ্যে মাঠে গড়াতে শুরু করেছে।