ভোরের নিস্তব্ধতা ভেঙে ফের কেঁপে উঠল বাংলাদেশের দক্ষিণ সীমান্ত। মিয়ানমারের অভ্যন্তরে চলা সংঘাতের জেরে কক্সবাজারের টেকনাফ সীমান্তে নতুন করে ছড়িয়েছে যুদ্ধ আতঙ্ক। শনিবার ভোর থেকে টানা কয়েক ঘণ্টা ভারী অস্ত্রের ঝনঝনানি, মর্টারশেলের বিকট শব্দ এবং অবিরাম গোলাগুলির ঘটনায় সীমান্তবর্তী গ্রামগুলোর বাসিন্দাদের দিন শুরু হয়েছে চরম উৎকণ্ঠার মধ্য দিয়ে। আতঙ্কের পারদ আরও চড়েছে যখন দেখা যায়, সীমান্ত পেরিয়ে আসা গুলি আঘাত হেনেছে বাংলাদেশের একাধিক বসতবাড়িতে।
শনিবার (১৩ ডিসেম্বর) ভোর থেকে সকাল পর্যন্ত প্রায় চার ঘণ্টা ধরে টেকনাফ উপজেলার হোয়াইক্যং ইউনিয়নের সীমান্তে চলে এই নারকীয় তাণ্ডব। স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, সীমান্তের ওপার থেকে ভেসে আসা মর্টারশেলের বিকট শব্দে বাড়িঘর বারবার কেঁপে উঠছিল। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছায় যে, নাফ নদীতে একটি মর্টারশেল পড়ার পর সেখান থেকে ধোঁয়ার বিশাল কুণ্ডলী উঠতে দেখা যায়।
বসতবাড়িতে বুলেটের আঘাত: অল্পের জন্য রক্ষা
সীমান্তবর্তী বাসিন্দাদের জন্য শনিবারের সকালটি ছিল বিভীষিকাময়। হোয়াইক্যং ২ নম্বর ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য সিরাজুল মোস্তফা লালু জানিয়েছেন, ভোর থেকে সকাল পর্যন্ত চলা এই Cross-border Firing-এর ঘটনায় পুরো এলাকা থমথমে হয়ে আছে। তিনি নিশ্চিত করেছেন যে, মিয়ানমারের ভেতর থেকে আসা গুলি হোয়াইক্যং বাজার সংলগ্ন মোহাম্মদ হোসন, আব্দুল কুদ্দুস এবং বালুখালী গ্রামের সরওয়ার আলমের বাড়ির টিনের চালায় আঘাত হেনেছে।
ভাগ্যক্রমে এই ঘটনায় কেউ হতাহত হননি, তবে বসতঘরে গুলি এসে পড়ার ঘটনায় স্থানীয়দের মধ্যে ছড়িয়ে পড়েছে তীব্র Panic। উত্তর পাড়া সংলগ্ন নাফ নদীতে মর্টারশেল পড়ার দৃশ্যও প্রত্যক্ষ করেছেন স্থানীয়রা। ধারণা করা হচ্ছে, রাখাইন রাজ্যে জান্তা বাহিনী ও বিদ্রোহী গোষ্ঠীর মধ্যে চলমান তীব্র লড়াইয়ের ‘স্পিলওভার ইফেক্ট’ হিসেবেই এই গোলাগুলি ও বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটছে।
প্রশাসনের সতর্কতা ও নজরদারি
হোয়াইক্যং পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ এসআই খোকন কান্তি রুদ্র ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করেছেন। তিনি জানান, ভোর থেকে সকাল পর্যন্ত সীমান্তের ওপার থেকে ভেসে আসা গোলাগুলির শব্দে এলাকা প্রকম্পিত ছিল। কয়েকটি বাড়িতে গুলি পড়ার তথ্য বা Report তারাও পেয়েছেন। বিষয়টি তাৎক্ষণিকভাবে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে অবহিত করা হয়েছে এবং সীমান্তে সর্বোচ্চ সতর্কতা বা High Alert বজায় রাখা হচ্ছে।
সংঘাতের প্রেক্ষাপট ও জনমনে ভীতি
দীর্ঘদিন ধরেই মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে দেশটির সরকারি বাহিনীর সঙ্গে বিদ্রোহী গোষ্ঠী আরাকান আর্মির (AA) তীব্র সংঘাত চলছে। এই Internal Conflict-এর প্রভাব বারবার পড়ছে বাংলাদেশ সীমান্তে। মাঝেমধ্যেই ওপার থেকে আসা গুলি ও মর্টারশেল বাংলাদেশের ভূখণ্ডে আঘাত হানছে, যা সীমান্ত এলাকার স্বাভাবিক জনজীবন ও নিরাপত্তাকে হুমকির মুখে ফেলছে। শনিবারের এই ঘটনা আবারও প্রমাণ করল যে, সীমান্তের ওপারে পরিস্থিতি কতটা ভয়াবহ এবং অস্থিতিশীল। বিজিবি ও কোস্টগার্ড সদস্যরা সীমান্তে কড়া নজরদারি চালিয়ে যাচ্ছেন, তবে স্থানীয় বাসিন্দাদের চোখেমুখে এখন শুধুই অনিশ্চয়তার ছাপ।