দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার আকাশ বারুদের গন্ধে ভারী। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রীর শান্তিপ্রস্তাবকে কার্যত নস্যাৎ করে দিয়ে যুদ্ধের পথেই হাঁটার ঘোষণা দিল থাইল্যান্ড। শনিবার (১৩ ডিসেম্বর) থাইল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী আনুতিন চার্নভিরাকুল স্পষ্ট জানিয়ে দিলেন, কম্বোডিয়ার সঙ্গে কোনো ‘Ceasefire Agreement’ বা যুদ্ধবিরতি চুক্তিতে পৌঁছায়নি তাঁর দেশ। ফলে বিতর্কিত সীমান্তে থাই সেনাবাহিনীর সামরিক অভিযান পুরোদমেই অব্যাহত থাকবে।
আন্তর্জাতিক কূটনীতি বনাম বাস্তব পরিস্থিতি
শুক্রবার (১২ ডিসেম্বর) রাতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেছিলেন যে, তিনি প্রতিবেশী দুই দেশ—থাইল্যান্ড ও কম্বোডিয়ার মধ্যে যুদ্ধবিরতি সফলভাবে সম্পন্ন করেছেন। অন্যদিকে, এই শান্তি আলোচনায় অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ‘Mediator’ বা মধ্যস্থতাকারী হিসেবে ভূমিকা রাখা মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিমও শনিবার সন্ধ্যা থেকে শত্রুতা অবসানের ডাক দিয়েছিলেন।
কিন্তু শনিবার সকালে সব জল্পনার অবসান ঘটিয়ে থাই প্রধানমন্ত্রী আনুতিন সোশ্যাল মিডিয়ায় এক বিস্ফোরক বার্তা দেন। ফেসবুকে তিনি লেখেন, “আমাদের ভূমি এবং জনগণের নিরাপত্তা নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত এবং হুমকি পুরোপুরি দূর না হওয়া পর্যন্ত থাইল্যান্ড ‘Military Action’ চালিয়ে যাবে। আমি বিষয়টি দ্ব্যর্থহীন ভাষায় স্পষ্ট করে দিতে চাই।” থাই প্রধানমন্ত্রীর এই অবস্থানে আন্তর্জাতিক মহলে নতুন করে উদ্বেগের সৃষ্টি হয়েছে।
এফ-১৬ দিয়ে হামলার অভিযোগ ও পাল্টা আঘাত
সীমান্ত পরিস্থিতি এখন চরম অগ্নিগর্ভ। কম্বোডিয়ার প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় অভিযোগ করেছে, শনিবার থাই সেনাবাহিনী তাদের ভূখণ্ডে দুটি এফ-১৬ (F-16 Fighter Jet) যুদ্ধবিমান ব্যবহার করে ব্যাপক বোমাবর্ষণ করেছে। সোশ্যাল মিডিয়ায় দেওয়া এক বিবৃতিতে তারা জানায়, ১৩ ডিসেম্বর বেশ কয়েকটি লক্ষ্যবস্তুতে অন্তত সাতটি বোমা ফেলা হয়েছে।
অন্যদিকে, থাইল্যান্ডও ছাড় দিতে নারাজ। থাই প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র সুরসান্ত কংসিরি জানিয়েছেন, শনিবার চং আন মা এলাকায় সংঘাতে তাদের চারজন সৈন্য নিহত হয়েছেন। গত সোমবার থেকে শুরু হওয়া এই রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে এখন পর্যন্ত অন্তত ১৪ জন থাই সেনার মৃত্যু হয়েছে। যদিও সাম্প্রতিক হামলায় নিজেদের কোনো ‘Casualty’ বা হতাহতের খবর স্বীকার করেনি কম্বোডিয়া।
মানবিক বিপর্যয় ও বাস্তুচ্যুত লাখো মানুষ
মাত্র ছয় দিনের সংঘাতে দুই দেশের সীমান্ত এলাকা মৃত্যুপুরীতে পরিণত হয়েছে। সরকারি হিসেবেই উভয় পক্ষে নিহতের সংখ্যা ২০ ছাড়িয়েছে, আহত হয়েছেন প্রায় ২০০ মানুষ। তবে সবথেকে ভয়াবহ চিত্র দেখা যাচ্ছে সাধারণ মানুষের জীবনে।
শতাব্দী প্রাচীন মন্দিরের মালিকানা এবং ৮০০ কিলোমিটার দীর্ঘ সীমান্ত নিয়ে বিরোধের জেরে দুই দেশের প্রায় ৬,০০,০০০ (ছয় লক্ষ) মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়ে পড়েছেন। নিজেদের ভিটেমাটি ছেড়ে নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে ছুটছে হাজার হাজার পরিবার। এই মানবিক বিপর্যয় বা ‘Humanitarian Crisis’ সামাল দিতে হিমশিম খাচ্ছে স্থানীয় প্রশাসন।
ভেস্তে গেল ট্রাম্পের শান্তি চুক্তি
উল্লেখ্য, গত অক্টোবরে ডোনাল্ড ট্রাম্পের মধ্যস্থতায় দুই দেশের মধ্যে একটি শান্তি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছিল। কিন্তু সোমবার সেই চুক্তি ভেঙে পড়ার পরেই নতুন করে সংঘাতের সূত্রপাত হয়। থাইল্যান্ড ও কম্বোডিয়ার এই লড়াই এখন কেবল সীমান্ত বিরোধে সীমাবদ্ধ নেই, বরং তা আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার জন্য বড় হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। থাই প্রধানমন্ত্রীর অনড় অবস্থানের পর এই সংঘাত কতদূর গড়ায়, সেদিকেই তাকিয়ে গোটা বিশ্ব।