আগামীর বাংলাদেশ হবে মেধা, মনন এবং ন্যায়বিচারের শক্ত ভিতে দাঁড়িয়ে থাকা এক আধুনিক রাষ্ট্র, যেখানে ব্যক্তির চেয়ে দলের এবং দলের চেয়ে দেশের স্বার্থ থাকবে ঊর্ধ্বে। আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচন এবং জনগণের প্রত্যাশাকে সামনে রেখে এমনই এক ‘Strategic Roadmap’ বা কৌশলগত রূপরেখা তুলে ধরলেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। তিনি স্পষ্ট করে দিলেন, সস্তা জনপ্রিয়তার চেয়ে রাষ্ট্র পরিচালনায় ‘Policy’ এবং ‘Rule of Law’ বা আইনের শাসনকেই সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হবে।
রবিবার (১৪ ডিসেম্বর) বিশিষ্ট নাগরিক ও পেশাজীবীদের সঙ্গে আয়োজিত এক উচ্চপর্যায়ের মতবিনিময় সভায় ভার্চুয়ালি যুক্ত হয়ে তিনি এই দিকনির্দেশনা প্রদান করেন। নতুন বাংলাদেশ বিনির্মাণে তারেক রহমানের এই খোলামেলা আলোচনা উপস্থিত বুদ্ধিজীবী ও বিশেষজ্ঞদের মধ্যে আশার সঞ্চার করেছে।
‘আনফেয়ার প্রিভিলেজ’ ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স
তারেক রহমান তার বক্তব্যে দ্ব্যর্থহীন ভাষায় জানান, রাষ্ট্রযন্ত্রের রন্ধ্রে রন্ধ্রে ঢুকে যাওয়া দুর্নীতি এবং স্বজনপ্রীতি উপড়ে ফেলাই হবে আগামী সরকারের প্রধান চ্যালেঞ্জ। বিগত সময়ে দলীয় পরিচয়ে বা ক্ষমতার অপব্যবহার করে যেসব ‘Unfair Privilege’ বা অন্যায্য সুবিধা নেওয়া হয়েছে, তা চিরতরে বন্ধ করার প্রতিশ্রুতি দেন তিনি।
তিনি বলেন, ‘‘আগামীর রাষ্ট্র পরিচালনায় নীতি ও আইনকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। দুর্নীতির লাগাম টেনে ধরা ছাড়া উন্নয়নের কোনো সুফলই সাধারণ মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছাবে না। এই মহাযজ্ঞে রাজনীতিবিদদের পাশাপাশি দেশের ‘Intellectuals’ বা পেশাজীবী ও বিশিষ্টজনদেরও সমানভাবে এগিয়ে আসতে হবে।’’
সিদ্ধান্ত গ্রহণে দূরদর্শিতা: জনপ্রিয় বনাম সঠিক
রাষ্ট্রনায়কোচিত প্রজ্ঞার পরিচয় দিয়ে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান বলেন, সরকার পরিচালনা করতে গিয়ে সবসময় হাততালি পাওয়ার মতো সিদ্ধান্ত নেওয়া সম্ভব নাও হতে পারে। তিনি ‘Populist Decision’ বা জনপ্রিয় সিদ্ধান্তের চেয়ে ‘Correct Decision’ বা সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
তার কথায়, ‘‘সব সময় সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়া দরকার। সব সময় জনপ্রিয় সিদ্ধান্তই যে সঠিক সিদ্ধান্ত হবে, তা কিন্তু নয়। রাষ্ট্রের দীর্ঘমেয়াদী কল্যাণের কথা ভেবে আমাদের হয়তো কিছু কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে হতে পারে, এবং সে বিষয়ে আমাদের সচেতন ও দৃঢ় থাকতে হবে।’’
ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা ও অর্থনৈতিক সংস্কার
আলোচনায় ঢাকার অসহনীয় যানজট এবং এর ফলে সৃষ্ট বিশাল অর্থনৈতিক ক্ষতির বিষয়টিও উঠে আসে। তারেক রহমান ট্রাফিক ব্যবস্থাকে আধুনিকায়নের ওপর বিশেষ জোর দেন। তিনি বলেন, ‘‘আমাদের ‘Traffic Management’ উন্নত করার পাশাপাশি যানজট কমাতে হবে। এটি কেবল সময়ের অপচয় নয়, বরং এটি জাতীয় অর্থনীতির জন্য একটি বড় ‘Setback’।’’
তিনি আরও যোগ করেন, ‘‘প্রতিদিন আমাদের যে অর্থ, সময় ও শ্রম এই যানজটের কারণে নষ্ট হচ্ছে, তাতে জাতি হিসেবে আমরা পিছিয়ে যাচ্ছি। আগামীর সরকারের জন্য এই অবস্থার পরিবর্তন করা এবং কর্মঘণ্টা বা ‘Man-hour’ রক্ষা করা হবে একটি অগ্রাধিকারমূলক কাজ।’’
এসি রুমের রাজনীতি নয়, মাঠের পোড় খাওয়া দল বিএনপি
অনুষ্ঠানে বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর দলের দীর্ঘ সংগ্রামের ইতিহাস স্মরণ করিয়ে দেন। তিনি বলেন, ‘‘বিএনপি কোনো শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত কক্ষে বসে রাজনীতি করা দল নয়। এটি সত্যিকার অর্থে আগুনে পুড়ে খাঁটি হওয়া একটি রাজনৈতিক শক্তি। আমাদেরকেই জাতিকে স্বপ্ন দেখাতে হবে, অন্যথায় দেশ এগোবে না। আর সেই স্বপ্ন দেখানোর কান্ডারি হিসেবে পথ দেখাচ্ছেন তারেক রহমান।’’
পেশাজীবী ও বিশিষ্টজনদের এই মিলনমেলায় উঠে আসে রাষ্ট্র সংস্কারের নানামুখী প্রস্তাবনা, যা আগামী দিনের বাংলাদেশ গড়তে সহায়ক ভূমিকা পালন করবে বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।