• আন্তর্জাতিক
  • সুদানে ৬ বীরের আত্মত্যাগ: বিশ্বশান্তি রক্ষায় রক্ত দিয়েও পিছু হঠবে না বাংলাদেশ

সুদানে ৬ বীরের আত্মত্যাগ: বিশ্বশান্তি রক্ষায় রক্ত দিয়েও পিছু হঠবে না বাংলাদেশ

আন্তর্জাতিক ১ মিনিট পড়া
সুদানে ৬ বীরের আত্মত্যাগ: বিশ্বশান্তি রক্ষায় রক্ত দিয়েও পিছু হঠবে না বাংলাদেশ

রিয়াদে ‘ইউএনএওসি’র গ্লোবাল ফোরামে পররাষ্ট্র উপদেষ্টার দৃপ্ত ঘোষণা; ডিজিটাল সন্ত্রাস, ‘ডিপফেক’ প্রযুক্তি ও ইসলামোফোবিয়া মোকাবিলায় বিশ্বনেতাদের ঐক্যের ডাক।

সুদানে জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনের ঘাঁটিতে অতর্কিত হামলায় ছয়জন বাংলাদেশি শান্তিরক্ষীর মর্মান্তিক মৃত্যুতে যখন গোটা জাতি শোকস্তব্ধ, ঠিক তখনই আন্তর্জাতিক মঞ্চে দাঁড়িয়ে অদম্য সাহসের বার্তা দিল বাংলাদেশ। রিয়াদে আয়োজিত জাতিসংঘের এক উচ্চপর্যায়ের সম্মেলনে পররাষ্ট্র বিষয়ক উপদেষ্টা মো. তৌহিদ হোসেন স্পষ্ট ভাষায় জানিয়ে দিলেন, এই শোককে শক্তিতে পরিণত করেই বৈশ্বিক শান্তি ও বহুপাক্ষিক সহযোগিতার (Multilateral Cooperation) প্রতি বাংলাদেশের অঙ্গীকার অটুট থাকবে। সন্ত্রাস বা সহিংসতা দিয়ে শান্তিরক্ষায় বাংলাদেশের ঐতিহাসিক ভূমিকাকে দমানো যাবে না।

রোববার (১৪ ডিসেম্বর) সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদে অনুষ্ঠিত জাতিসংঘ সভ্যতাসমূহের জোট বা ‘ইউএনএওসি’ (UNAOC)-এর ১১তম গ্লোবাল ফোরামে দেওয়া এক আবেগঘন অথচ বলিষ্ঠ বক্তব্যে তিনি এ কথা বলেন।

কাপুরুষোচিত হামলা ও শোকাবহ বাস্তবতা

বক্তব্যের শুরুতেই পররাষ্ট্র উপদেষ্টা সুদানের কাদুগলিতে সংঘটিত বর্বরোচিত হামলার তীব্র নিন্দা জানান। তিনি বলেন, “গতকাল আমাদের শান্তিরক্ষীদের ওপর যে হামলা চালানো হয়েছে, তা কেবল কাপুরুষোচিতই নয়, বিশ্বশান্তির ওপর এক বড় আঘাত। সুদানে জাতিসংঘ ‘পিসকিপিং মিশন’ (Peacekeeping Mission)-এর লজিস্টিকস ঘাঁটিতে (Logistics Base) এই হামলায় আমরা ছয়জন বীর সন্তানকে হারিয়েছি, আরও কয়েকজন আহত হয়েছেন। এই ঘটনা আমাদের গভীরভাবে শোকাহত করেছে ঠিকই, কিন্তু শান্তির পথে আমাদের অবিচল যাত্রাকে থামিয়ে দিতে পারেনি।”

তিনি উল্লেখ করেন, এই ঘটনা এমন এক রূঢ় বাস্তবতাকে সামনে নিয়ে এসেছে, যেখানে বিশ্বজুড়ে সংঘাত ও মানবিক সংকট ক্রমশ গভীর হচ্ছে। যুদ্ধবিধ্বস্ত অঞ্চলগুলোতে শান্তিরক্ষীদের নিরাপত্তা আজ চরম হুমকির মুখে।

ডিজিটাল সন্ত্রাস ও ‘ডিপফেক’ প্রযুক্তির হুমকি

আধুনিক বিশ্বের নতুন নতুন চ্যালেঞ্জের কথা তুলে ধরে তৌহিদ হোসেন বলেন, একবিংশ শতাব্দীতে যুদ্ধের ধরণ বদলে গেছে। এখন কেবল অস্ত্রের যুদ্ধ নয়, চলছে তথ্যের যুদ্ধ। তিনি সতর্ক করে বলেন, “ডিজিটাল যুগে মানুষে-মানুষে বিভাজন আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে। ভুয়া তথ্য (Fake News), ঘৃণাত্মক বক্তব্য (Hate Speech) এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই-এর অপব্যবহারের মাধ্যমে তৈরি ‘ডিপফেক’ (Deepfake) প্রযুক্তি আজ শান্তি ও মানবিক মূল্যবোধের জন্য এক ভয়াবহ হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে।”

বিশ্বজুড়ে বেড়ে চলা বিদেশিবিদ্বেষ (Xenophobia), অসহিষ্ণুতা, বর্ণবাদ এবং ইসলামোফোবিয়া (Islamophobia) মোকাবিলায় তিনি বিশ্বনেতাদের আরও সতর্ক ও দায়িত্বশীল হওয়ার আহ্বান জানান।

শান্তির সংস্কৃতি ও রোহিঙ্গা সংকট: বাংলাদেশের মানবিক অবস্থান

জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা কার্যক্রমে অন্যতম শীর্ষ সেনা প্রেরণকারী দেশ হিসেবে বাংলাদেশের গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাসের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে উপদেষ্টা বলেন, বাংলাদেশ ‘কালচার অফ পিস’ বা শান্তির সংস্কৃতিতে বিশ্বাসী। তাঁর মতে, শান্তি মানে কেবল যুদ্ধের অনুপস্থিতি নয়; বরং ন্যায়বিচার, সহমর্মিতা ও মানবিক মর্যাদার ওপর প্রতিষ্ঠিত এক সমাজব্যবস্থা।

এই প্রসঙ্গের রেশ ধরেই তিনি মিয়ানমার থেকে জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত ১২ লাখের বেশি রোহিঙ্গাকে আশ্রয় দেওয়ার বিষয়টি উত্থাপন করেন। তিনি দ্ব্যর্থহীন কণ্ঠে বলেন, “বাংলাদেশ মানবিকতার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। তবে এই সংকটের স্থায়ী সমাধান প্রয়োজন। গণহত্যার শিকার এই বিপুল সংখ্যক মানুষের নিরাপত্তা ও পূর্ণ মর্যাদার সঙ্গে নিজ দেশে প্রত্যাবর্তনের (Repatriation) সুযোগ নিশ্চিত করতে বিশ্ব সম্প্রদায়কে আরও কার্যকর ভূমিকা রাখতে হবে।”

ভবিষ্যতের রূপরেখা: তরুণদের ক্ষমতায়ন ও জবাবদিহিতা

বৈশ্বিক সংকট মোকাবিলায় পররাষ্ট্র উপদেষ্টা মো. তৌহিদ হোসেন বেশ কিছু সুনির্দিষ্ট প্রস্তাবনা তুলে ধরেন। তিনি তরুণ প্রজন্মের ক্ষমতায়ন (Youth Empowerment) এবং প্রজন্মান্তরে সংলাপের ওপর জোর দেন। তিনি বলেন, অন্তর্ভুক্তিমূলক শিক্ষায় বিনিয়োগ এবং শিল্প, ক্রীড়া ও দায়িত্বশীল গণমাধ্যমের (Responsible Media) মাধ্যমে সাংস্কৃতিক বিনিময় বাড়াতে হবে। এতে জাতিতে জাতিতে সহমর্মিতা ও আস্থা গড়ে উঠবে।

উপদেষ্টা ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে সব ধরনের উসকানিমূলক কর্মকাণ্ড কঠোরভাবে প্রত্যাখ্যান করার আহ্বান জানান। পাশাপাশি, বাস্তুচ্যুত ও নির্যাতিতের ন্যায়বিচার ও জবাবদিহিতা (Accountability) নিশ্চিত করার দাবি জানান।

রিয়াদে বিশ্বনেতাদের মিলনমেলা

‘ইউএনএওসি: মানবতার জন্য দুই দশকের সংলাপ- বহুমুখী বিশ্বে পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও বোঝাপড়ার নতুন যুগের অগ্রগতি’—এই প্রতিপাদ্যকে সামনে রেখে রিয়াদে শুরু হয়েছে দুদিনব্যাপী এই গ্লোবাল ফোরাম। ইউএনএওসি-এর ২০তম বার্ষিকী উপলক্ষে আয়োজিত এই সম্মেলনে রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব, আন্তর্জাতিক সংস্থার প্রধান, ধর্মীয় নেতা, এবং ‘প্রাইভেট সেক্টর’ (Private Sector) ও সিভিল সোসাইটির প্রতিনিধিরা অংশ নিয়েছেন। সংস্থাটির ভবিষ্যৎ কর্মপন্থা নির্ধারণে বাংলাদেশের এই জোরালো অবস্থান ফোরামে এক নতুন মাত্রা যোগ করেছে।

Tags: united nations rohingya crisis sudan attack bangladesh peacekeeping unaoc riyadh touhid hossain global peace deepfake technology islamophobia foreign affairs