ঢাকা: মহান বিজয় দিবস উপলক্ষে দেশবাসী ও প্রবাসী বাংলাদেশিদের শুভেচ্ছা জানানোর পাশাপাশি একাত্তরের রণাঙ্গনের বীর শহীদদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানিয়েছেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। সোমবার (১৫ ডিসেম্বর) গণমাধ্যমে পাঠানো এক বিশেষ বাণীতে তিনি কেবল ঐতিহাসিক বিজয়ের স্মৃতিচারণই করেননি, বরং চব্বিশের ছাত্র-জনতার বিপ্লবকে স্মরণ করে একটি বৈষম্যহীন ও গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ গড়ার জোরালো আহ্বান জানিয়েছেন।
বাণীতে তিনি হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেন, ৭১-এ দেশ শত্রুমুক্ত হলেও চক্রান্তকারীদের নীল নকশা বা ‘ব্লু-প্রিন্ট’ এখনও পুরোপুরি শেষ হয়নি। তাই অর্জিত স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষায় জাতীয় ঐক্যের কোনো বিকল্প নেই।
ইতিহাসের বাঁক ও বীরদের প্রতি স্যালুট
বাণীর শুরুতে তারেক রহমান একাত্তরের সেই উত্তাল দিনগুলোর কথা স্মরণ করেন। তিনি বলেন, ‘দীর্ঘ ৯ মাসের রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধের পর ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর জাতি চূড়ান্ত বিজয় অর্জন করে। এই দিনে বাংলাদেশ নামের একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের অভ্যুদয় ঘটে। আমি গভীর শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করছি সেই সব বীর মুক্তিযোদ্ধা ও শহীদদের, যাদের আত্মত্যাগে আমরা পেয়েছি লাল-সবুজের পতাকা।’
স্বাধীনতাযুদ্ধে সম্ভ্রমহারা মা-বোনদের ত্যাগের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘বিদেশি শৃঙ্খল থেকে দেশকে মুক্ত করতে যেসব মা-বোন সর্বোচ্চ ত্যাগ স্বীকার করেছেন, আমি তাদের জানাই সশ্রদ্ধ সালাম। সুখ, শান্তি ও সমৃদ্ধিতে ভরে উঠুক দেশের প্রতিটি মানুষের জীবন।’
বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান ইতিহাসের প্রেক্ষাপট তুলে ধরে বলেন, ‘১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ স্বাধীনতার ঘোষক প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের ডাকে শুরু হওয়া স্বাধীনতাযুদ্ধ ১৬ ডিসেম্বর পাক হানাদার বাহিনীকে পরাজিত করার মাধ্যমে পূর্ণতা পায়। দেশের অদম্য বীর মুক্তিযোদ্ধারা জীবনবাজি রেখে এ বিজয় ছিনিয়ে এনেছিলেন। তাই ১৬ ডিসেম্বর আমাদের জাতির অহংকার, আনন্দ আর বেদনার এক মহাকাব্যিক দিন।’
গণতন্ত্রের পুনরুদ্ধার ও ‘ফ্যাসিস্ট’ শাসনের অবসান
তারেক রহমান তার বাণীতে সদ্য বিদায়ী রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট ও দীর্ঘ ১৬ বছরের শাসনব্যবস্থার তীব্র সমালোচনা করেন। তিনি বলেন, ‘শোষণমুক্ত ও সামাজিক ন্যায়বিচার ভিত্তিক গণতান্ত্রিক নীতিমালার ওপর বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার প্রত্যয় ছিল নতুন রাষ্ট্রের মর্মমূলে। কিন্তু অমানবিক এক ফ্যাসিস্ট গোষ্ঠী (Fascist Group) বারবার সেই প্রত্যয়কে মাটিচাপা দিয়ে জনগণের ওপর সর্বনাশা দুঃশাসন চাপিয়ে দিয়েছিল। তারা বহুদলীয় গণতন্ত্রের (Multi-party Democracy) অগ্রযাত্রাকে স্তব্ধ করে দিয়েছিল।’
তিনি আরও যোগ করেন, ‘গত ১৬ বছর ধরে একের পর এক প্রহসনের একতরফা নির্বাচন (One-sided Election) করে জনমতকে তাচ্ছিল্য করা হয়েছে। কেড়ে নেওয়া হয়েছিল মানুষের সব গণতান্ত্রিক অধিকার। নাগরিক স্বাধীনতাকে অদৃশ্য করে জনগণকে করা হয়েছিল অধিকারহারা। গণতন্ত্রহীন দেশে নিরঙ্কুশ ক্ষমতার দাপটে সর্বত্র নেমে এসেছিল হতাশা, ভয় আর নৈরাজ্যের অন্ধকার।’
সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, ‘যিনি জীবনের দীর্ঘ সময় গণতন্ত্রের জন্য লড়াই করেছেন, সেই অবিসংবাদিত নেত্রীকে অন্যায়ভাবে বন্দি করে অন্ধকার কারাগারে রাখা হয়েছিল। অমানবিক নিপীড়ক শাসকগোষ্ঠী ক্ষমতা চিরস্থায়ী করতে একের পর এক গণবিরোধী পদক্ষেপ নিয়েছিল।’
জুলাই-আগস্ট বিপ্লব ও আগামীর রূপরেখা
বাণীতে ২৪-এর ছাত্র-জনতার আন্দোলনের প্রসঙ্গটি বিশেষ গুরুত্ব পায়। তারেক রহমান বলেন, ‘ফ্যাসিস্টদের হাত থেকে প্রিয় মাতৃভূমির স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব রক্ষা এবং গণতন্ত্রকে বিপদমুক্ত করতে মহান বিজয় দিবসের প্রেরণায় বলীয়ান হয়ে আমাদের জাতীয় ঐক্য গড়ে ওঠে। যার ফলে ২৪-এর জুলাই-আগস্টের ছাত্র-জনতার দুনিয়া-কাঁপানো আন্দোলনে তারা পরাজিত হয়। পতন ঘটে ইতিহাসের এক নিষ্ঠুরতম একনায়কের (Dictator)।’
তবে তিনি সতর্ক করে দিয়ে বলেন, ‘আগ্রাসী শক্তি আমাদের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব অবজ্ঞা করার ঔদ্ধত্য দেখাচ্ছে। ওই অপশক্তির এদেশীয় এজেন্টরা (Agents) আমাদের অর্জিত স্বাধীনতা বিপন্ন করার চক্রান্তজাল বুনে চলেছে। তাই এই মুহূর্তে আমাদের সতর্ক থাকতে হবে।’
ভবিষ্যৎ কর্মপন্থা ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা প্রসঙ্গে বিএনপির শীর্ষ এই নেতা বলেন, ‘দেশে আবার স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্বের সুরক্ষা ও বহুদলীয় গণতন্ত্রের পুনরুজ্জীবনের প্রত্যাশা জেগে উঠেছে। এই মুহূর্তে নির্বিঘ্নে অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের মাধ্যমে একটি জনকল্যাণমুখী ও জবাবদিহিমূলক সরকার (Accountable Government) গঠনের পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে।’
পরিশেষে তিনি একটি সম্প্রীতির বাংলাদেশের আহ্বান জানিয়ে বলেন, ‘একটি বৈষম্যহীন বাংলাদেশের জন্য এই বিজয়ের দিনে আমাদের অঙ্গীকার হোক—আমরা বিভাজন ভুলে, হিংসা ভুলে মানুষ হিসেবে মানুষের পাশে থাকবো।’