ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র এবং ঢাকা-৮ আসনের সম্ভাব্য স্বতন্ত্র প্রার্থী শরিফ ওসমান হাদিকে প্রকাশ্য দিবালোকে গুলি করে হত্যাচেষ্টার ঘটনার ৭২ ঘণ্টা পেরিয়ে গেছে। কিন্তু এই ‘হাই-প্রোফাইল’ হামলার মূল ‘এক্সিকিউটর’ বা শুটাররা এখনও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ধরাছোঁয়ার বাইরে। রাজধানী কাঁপানো এই ‘শুটিং মিশনে’ অংশ নেওয়া দুই শুটার—ফয়সাল ও আলমগীর ময়মনসিংহ সীমান্ত ব্যবহার করে ভারতে পালিয়ে গেছেন কি না, তা নিয়ে ধুম্রজাল সৃষ্টি হয়েছে। বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) বলছে, বিষয়টি এখনও নিশ্চিত নয়, তবে রহস্যের জট খুলতে একজন ‘কি-ম্যান’ (Key-man) বা মূল সূত্রধরকে খুঁজছে তারা।
সোমবার (১৫ ডিসেম্বর) ময়মনসিংহে ৩৯ বিজিবির সেক্টর সদর দপ্তরে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে সেক্টর কমান্ডার কর্নেল সরকার মো. মোস্তাফিজুর রহমান জানান, শুটারদের অবস্থান নিশ্চিত করতে তারা ‘মানবপাচারকারী’ সিন্ডিকেটের এক হোতাকে ট্র্যাক করছেন।
সীমান্তের ‘সেফ প্যাসেজ’ ও ফিলিপ স্নাল রহস্য
গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে গুঞ্জন উঠেছে, হামলার পরপরই শুটাররা ময়মনসিংহের হালুয়াঘাট সীমান্তকে ‘সেফ প্যাসেজ’ হিসেবে ব্যবহার করে ভারতে পালিয়েছে। তবে বিজিবি এখনই এর শতভাগ নিশ্চয়তা দিচ্ছে না। বিজিবির সেক্টর কমান্ডার জানান, তারা ফিলিপ স্নাল নামের একজন ব্যক্তিকে হন্যে হয়ে খুঁজছেন। হালুয়াঘাটের ভুটিয়াপাড়া এলাকার বাসিন্দা ফিলিপ স্থানীয় মানবপাচারকারী চক্রের (Human Trafficking Ring) সঙ্গে জড়িত বলে অভিযোগ রয়েছে।
বিজিবির ভাষ্যমতে, যদি অভিযুক্তরা সীমান্ত ক্রস করে থাকে, তবে তা ফিলিপের মাধ্যমেই হওয়ার কথা। বিজিবি কমান্ডার বলেন, “ফিলিপ স্নাল এই ঘটনার ‘মিসিং লিংক’। তাকে আটক করা গেলে জানা যাবে—কারা তার সঙ্গে যোগাযোগ করেছিল, বর্ডার ক্রসিংয়ের জন্য কত টাকার ‘ট্রানজেকশন’ হয়েছে এবং ভারতের ওপারে কাদের ‘শেল্টার’-এ তারা অবস্থান করছে।”
যৌথ অভিযান ও সন্দেহভাজনদের জিজ্ঞাসাবাদ
হাদিকে গুলির ঘটনার পর থেকেই সীমান্তে ‘হাই অ্যালার্ট’ জারি করা হয়। সেক্টর কমান্ডার জানান, ১২ ডিসেম্বর ঘটনার দিন রাত সাড়ে ৮টা থেকেই ৩৯ বিজিবি সীমান্তের সম্ভাব্য রুটগুলোতে চেকপোস্ট ও টহল জোরদার করে। পুলিশ ও বিজিবির ‘জয়েন্ট অপারেশন’ (Joint Operation)-এর অংশ হিসেবে সন্দেহভাজনদের ওপর নজরদারি বাড়ানো হয়।
ফিলিপ স্নাল আত্মগোপনে থাকলেও তার ওপর চাপ সৃষ্টি করতে এবং তথ্য বের করতে তার পরিবারের সদস্যদের জিজ্ঞাসাবাদের আওতায় আনা হয়েছে। ফিলিপের স্ত্রী ডেলটা চিরান, শ্বশুর ইয়ারসন রংডি এবং সহযোগী লুইস লেংমিঞ্জাকে আটক করে বারোমারী বিওপিতে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। সর্বশেষ সোমবার ভোরে ফিলিপের আত্মীয় বেঞ্জামিন রিচানকেও (৩০) আটক করা হয়েছে।
কর্নেল মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, “পুলিশের পক্ষ থেকে আমাদের কাছে স্পেসিফিক রিকুইজিশন ছিল। আমরা বিভিন্ন সোর্সের তথ্য দিয়ে পুলিশকে ‘ইনটেলিজেন্স সাপোর্ট’ দিচ্ছি, যাতে অপরাধীরা কোনোভাবেই দেশত্যাগ করতে না পারে।”
সিসিটিভি ফুটেজ ও গ্রেফতারের খতিয়ান
গত শুক্রবার (১২ ডিসেম্বর) দুপুরে রাজধানীর পল্টনের বক্স কালভার্ট এলাকায় রিকশায় যাওয়ার সময় শরিফ ওসমান হাদির ওপর অতর্কিত গুলি চালায় মোটরবাইক আরোহী দুই দুর্বৃত্ত। সিসিটিভি ফুটেজ (CCTV Footage) বিশ্লেষণ করে হামলাকারী হিসেবে নিষিদ্ধ ঘোষিত ছাত্রলীগ নেতা ফয়সাল করিম মাসুদ ও আলমগীর শেখকে শনাক্ত করে পুলিশ।
মূল শুটাররা অধরা থাকলেও তাদের পালানোর সহায়তাকারী ও ‘লজিস্টিক সাপোর্ট’ প্রদানকারীদের গ্রেফতারে অভিযান অব্যাহত রয়েছে। এখন পর্যন্ত এই ঘটনায় আটক ও গ্রেফতারের তালিকায় রয়েছেন—হামলায় ব্যবহৃত বাইকের মালিক হান্নান, প্রধান আসামি ফয়সালের স্ত্রী সামিয়া, শ্যালক শিপু ও প্রেমিকা মারিয়া। এছাড়া সীমান্ত পারাপারে জড়িত থাকার অভিযোগে সঞ্জয় চিসিম ও সিবিরন দিও এবং রোববার রাতে দুই সিএনজি চালককে আটক করা হয়েছে।
ঘটনার দুদিন পর পল্টন থানায় হত্যাচেষ্টা মামলা দায়ের করেন ইনকিলাব মঞ্চের সদস্য সচিব আবদুল্লাহ আল জাবেদ। আটককৃতদের মধ্যে চারজনকে সোমবার ওই মামলায় আনুষ্ঠানিকভাবে গ্রেফতার (Arrest) দেখানো হয়েছে।