যুদ্ধবিধ্বস্ত গাজায় মৃত্যুর মিছিল থামার কোনও লক্ষণ নেই। এবার বোমার আঘাত নয়, হাড়হিম করা ঠান্ডা এবং চরম মানবিক সংকটের বলি হতে হল এক সদ্যোজাতকে। গাজা উপত্যকায় প্রবল শীতে জমে মৃত্যু হয়েছে এক ফিলিস্তিনি শিশুর। স্থানীয় স্বাস্থ্য মন্ত্রক সূত্রে খবর, শিশুটির বয়স ছিল মাত্র দুই সপ্তাহ। একদিকে প্রকৃতির রুদ্ররূপ, অন্যদিকে ইসরায়েলের কঠোর ‘Blockade’ বা নিষেধাজ্ঞা— এই দুইয়ের যাঁতাকলে পিষে মরছে গাজার সাধারণ মানুষ। প্রবল শীতেও গাজায় প্রয়োজনীয় আশ্রয়সামগ্রী এবং মানবিক সাহায্য প্রবেশে বাধা দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে ইসরায়েলি সেনার বিরুদ্ধে।
হাইপোথার্মিয়া ও একরত্তি মহম্মদের করুণ পরিণতি
মঙ্গলবার (১৬ ডিসেম্বর) গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রক এক হৃদয়বিদারক বিবৃতিতে জানিয়েছে, প্রবল ঠান্ডার কারণে ‘Hypothermia’-য় আক্রান্ত হয়ে মৃত্যু হয়েছে মহম্মদ খলিল আবু আল-খায়ের নামের ওই শিশুটির। চিকিৎসকদের হাজারও চেষ্টা সত্ত্বেও তাকে বাঁচানো সম্ভব হয়নি।
আল জাজিরার প্রতিবেদনে উঠে এসেছে এক ভয়াবহ চিত্র। সেখানে বলা হয়েছে, এই মৃত্যু কেবল আবহাওয়াজনিত দুর্ঘটনা নয়, বরং এটি গাজার মৌলিক সুরক্ষা ব্যবস্থা বা ‘Basic Safety Infrastructure’ পরিকল্পিতভাবে ধ্বংস করার ফল। পরিবারগুলি বাধ্য হয়ে ভেজা মাটিতে, জরাজীর্ণ তাঁবুতে দিন কাটাচ্ছে। সেখানে উত্তাপ পাওয়ার কোনও ‘Heating System’ নেই, নেই বিদ্যুৎ সংযোগ। সদ্যোজাতদের উষ্ণ রাখার মতো পর্যাপ্ত শীতবস্ত্র বা কম্বলের তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে। যখন খাদ্য, জ্বালানি এবং মাথার ছাদটুকুও কেড়ে নেওয়া হয়, তখন শীতও যে কতটা প্রাণঘাতী হয়ে উঠতে পারে, মহম্মদের মৃত্যু তার জলজ্যান্ত প্রমাণ।
ধ্বংসস্তূপের মাঝে বেঁচে থাকার লড়াই
টানা দুই বছরেরও বেশি সময় ধরে চলা ইসরায়েলি আগ্রাসনে গাজার মানচিত্র কার্যত বদলে গিয়েছে। পরিসংখ্যান বলছে, উপত্যকার ৮০ শতাংশেরও বেশি ‘Infrastructure’ বা কাঠামো মাটির সঙ্গে মিশিয়ে দেওয়া হয়েছে। লক্ষ লক্ষ পরিবার আজ গৃহহীন, আশ্রয় নিয়েছে দুর্বল প্লাস্টিকের তাঁবু কিংবা জনাকীর্ণ অস্থায়ী শিবিরে (Temporary Shelters)।
পরিস্থিতি আরও জটিল করে তুলেছে সাম্প্রতিক প্রাকৃতিক দুর্যোগ। প্রবল ঝড় ও বৃষ্টিপাতে ভেসে গিয়েছে শত শত তাঁবু। কনকনে ঠান্ডা বাতাস এবং বৃষ্টির জেরে তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়েছে বহু আশ্রয়কেন্দ্র। এই দুর্যোগে ইতিমধ্যেই অন্তত ১১ জনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গিয়েছে।
গাজা সিটি থেকে বাস্তুচ্যুত এক অসহায় মা, উম্মে মহম্মদ আসালিয়া আল জাজিরাকে নিজের অভিজ্ঞতার কথা জানাতে গিয়ে বলেন, “আমরা আগুনের তাপে বাচ্চাদের ভেজা কাপড় শুকানোর আপ্রাণ চেষ্টা করছি। ছেলেমেয়েদের পরানোর মতো কোনও অতিরিক্ত পোশাক নেই। আমাদের যে তাঁবু দেওয়া হয়েছে, তা এই হাড়কাঁপানো ‘Winter Season’ সহ্য করার মতো মজবুত নয়। আমাদের জরুরি ভিত্তিতে কম্বল দরকার, কিন্তু কেউ শুনছে না।”
ত্রাণ প্রবেশে বাধা ও রাষ্ট্রপুঞ্জের হুঁশিয়ারি
গাজায় ত্রাণ বণ্টনের দায়িত্বে থাকা রাষ্ট্রপুঞ্জের ফিলিস্তিনি শরণার্থী বিষয়ক সংস্থা (UNRWA) সরাসরি অভিযোগের আঙুল তুলেছে ইসরায়েলি সরকারের দিকে। তাদের দাবি, যুদ্ধের অজুহাতে গাজায় সরাসরি ত্রাণবাহী ট্রাক প্রবেশে বাধা সৃষ্টি করছে ইসরায়েল। যাকে আন্তর্জাতিক মহল ‘War Tactics’ হিসেবেও দেখছে।
মঙ্গলবার সোশ্যাল মিডিয়ায় দেওয়া এক বিবৃতিতে UNRWA জানিয়েছে, “ক্ষতিগ্রস্ত ভবন ধসে মানুষ মারা যাচ্ছেন, কারণ তাঁরা নিরুপায় হয়ে সেখানেই আশ্রয় নিয়েছিলেন। এখন ঠান্ডার সংস্পর্শে এসে শিশুদের মৃত্যুর খবরও আমাদের কাছে আসছে।” সংস্থার তরফে আরও বলা হয়, “এই অমানবিক পরিস্থিতি এখনই বন্ধ হওয়া দরকার। গাজায় ব্যাপকভাবে ‘Humanitarian Aid’ পৌঁছানো নিশ্চিত করতে হবে, নতুবা আরও বড় বিপর্যয় অপেক্ষা করছে।”