দ্বিতীয় মেয়াদে হোয়াইট হাউসের মসনদে বসার পর কেটেছে মাত্র ১০ মাস। এরই মধ্যে বিশ্বজুড়ে চলা অন্তত আটটি যুদ্ধ থামিয়ে দেওয়ার দাবি করলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প। বছরের শেষলগ্নে বুধবার (১৭ ডিসেম্বর) রাতে জাতির উদ্দেশে দেওয়া এক ভাষণে তিনি নিজের প্রশাসনের সাফল্যের খতিয়ান তুলে ধরেন। নিজের স্বভাবসুলভ ভঙ্গিতে ট্রাম্প দাবি করেছেন, তার অদম্য কূটনৈতিক প্রচেষ্টায় গত তিন হাজার বছরের ইতিহাসে এই প্রথমবার মধ্যপ্রাচ্যে প্রকৃত শান্তি ফিরে এসেছে।
যুক্তরাষ্ট্রের স্থানীয় সময় বুধবার রাতে দেওয়া এই ভাষণে ট্রাম্প অর্থনীতি, Geopolitics (ভূ-রাজনীতি) এবং অভিবাসন নিয়ে বেশ কিছু চাঞ্চল্যকর তথ্য উপস্থাপন করেন। তার দাবি, তিনি কেবল যুক্তরাষ্ট্রের হৃত গৌরবই পুনরুদ্ধার করেননি, বরং বিশ্বকে পারমাণবিক হুমকির মুখ থেকেও রক্ষা করেছেন।
বিশ্বমঞ্চে যুক্তরাষ্ট্রের ‘প্রত্যাবর্তন’ ও যুদ্ধের সমাপ্তি
ভাষণে ট্রাম্প তার ১০ মাসের শাসনকালকে ‘ঐতিহাসিক’ হিসেবে অভিহিত করেন। তিনি বলেন, “আমি মার্কিন শক্তি পুনরুদ্ধার করেছি। মাত্র ১০ মাসে আটটি যুদ্ধের মীমাংসা করেছি।”
মধ্যপ্রাচ্য নিয়ে নিজের সাফল্যের বয়ান দিতে গিয়ে তিনি ইরানের Nuclear Threat (পারমাণবিক হুমকি) ধ্বংস এবং গাজা যুদ্ধ সমাপ্তির বিষয়টি সামনে আনেন। ট্রাম্প বলেন, “ইরানের পারমাণবিক হুমকি নির্মূল করেছি এবং গাজায় যুদ্ধ শেষ করেছি। এর ফলে ৩ হাজার বছরে প্রথমবারের মতো মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি এসেছে।” তার এই বক্তব্য আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে, যদিও বিশ্লেষকরা পরিস্থিতির স্থায়িত্ব নিয়ে ভিন্নমত পোষণ করেন।
অর্থনীতর ট্রাম্পকার্ড ‘ট্যারিফ’ ও ১৮ ট্রিলিয়নের বিনিয়োগ
নিজের অর্থনৈতিক দর্শন ব্যাখ্যা করতে গিয়ে ট্রাম্প ‘শুল্ক’ বা Tariff-কে তার প্রশাসনের সবচেয়ে শক্তিশালী কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক অস্ত্র হিসেবে উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, “আমার প্রিয় শব্দ—ট্যারিফ। বহু দশক ধরে অন্যান্য দেশ আমাদের বিরুদ্ধে এটি সফলভাবে ব্যবহার করে আসছে, এবার আমরা করছি।”
প্রেসিডেন্টের দাবি, তার এই রক্ষণশীল নীতির ফলেই যুক্তরাষ্ট্রে রেকর্ড পরিমাণ ১৮ ট্রিলিয়ন (১৮ লাখ কোটি) ডলারের Investment নিশ্চিত হয়েছে। তিনি বলেন, “কোম্পানিগুলো জানে, যুক্তরাষ্ট্রে বিনিয়োগ করলে কোনো শুল্ক নেই। এ কারণেই তারা রেকর্ড সংখ্যায় ফিরে আসছে এবং অভাবনীয় হারে কারখানা ও প্ল্যান্ট নির্মাণ করছে। এর অর্থ নতুন Job Creation, বেতন বৃদ্ধি এবং জাতীয় নিরাপত্তা শক্তিশালী হওয়া।”
তবে ট্রাম্পের এই শুল্ক নীতির সঙ্গে বাস্তবতার ফারাক রয়েছে বলে মনে করেন অনেক অর্থনীতিবিদ। সমালোচকদের মতে, চড়া শুল্কের কারণে আমদানিপণ্যের দাম বেড়েছে, যা সাধারণ মার্কিন ভোটারদের মধ্যে কিছুটা অসন্তোষ তৈরি করেছে।
সীমান্ত সুরক্ষা ও ‘জিরো’ অভিবাসন
অভিবাসন ইস্যুতে নিজের কঠোর অবস্থানের কথা পুনর্ব্যক্ত করে সাবেক ডেমোক্র্যাট প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের কড়া সমালোচনা করেন ট্রাম্প। তিনি বলেন, সীমান্ত বন্ধ করতে কংগ্রেসের নতুন আইনের প্রয়োজন হয়নি, প্রয়োজন ছিল কেবল সদিচ্ছার।
নিজের প্রশাসনের কৃতিত্ব দাবি করে ট্রাম্প বলেন, “আমি ক্ষমতায় আসার প্রথম দিন থেকেই দক্ষিণ সীমান্তে আক্রমণ বন্ধে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নিয়েছি। গত সাত মাস ধরে আমাদের দেশে কোনো অবৈধ অভিবাসীকে (Illegal Immigrant) প্রবেশের অনুমতি দেওয়া হয়নি। অথচ আগে সবাই বলেছিল, এমন পদক্ষেপ নাকি একেবারেই অসম্ভব।”
সেনাদের জন্য ‘ক্রিসমাস উপহার’
ভাষণের শেষ পর্যায়ে মার্কিন সেনাদের জন্য এক বড় সুখবর দেন প্রেসিডেন্ট। তিনি ঘোষণা করেন, বড়দিনের আগেই প্রায় ১৪ লাখ ৫০ হাজার সেনা সদস্য এককালীন ১ হাজার ৭৭৬ ডলার করে বিশেষ ভাতা পাবেন।
এই অর্থায়নও তার শুল্ক নীতির সুফল বলে দাবি করেন ট্রাম্প। তিনি বলেন, দেশের অর্থনীতি মজবুত হওয়ার কারণেই সেনাদের হাতে এই অর্থ তুলে দেওয়া সম্ভব হচ্ছে। বছরের শেষ সময়ে প্রেসিডেন্টের এই ঘোষণা সামরিক বাহিনীর সদস্যদের মধ্যে ইতিবাচক সাড়া ফেলবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।