গাজা ইস্যুতে যখন আন্তর্জাতিক মহলে ইজরায়েল অনেকটা কূটনৈতিকভাবে একঘরে, ঠিক সেই সময়েই সংযুক্ত আরব আমিরাতের (UAE) সঙ্গে এক গোপন ও নজিরবিহীন অস্ত্র চুক্তির খবর প্রকাশ্যে এল। ইজরায়েলি প্রতিরক্ষা খাতের অন্যতম বৃহৎ প্রতিষ্ঠান ‘এলবিট সিস্টেমস’-এর সঙ্গে ২৩০ কোটি মার্কিন ডলারের (প্রায় ২৭ হাজার কোটি টাকা) এই বিশাল সামরিক চুক্তিটি সম্পন্ন করেছে আবুধাবি। ফরাসি অনুসন্ধানী সংবাদমাধ্যম ‘ইন্টেলিজেন্স অনলাইন’-এর এক প্রতিবেদনে এই চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে এসেছে, যা মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতিতে নতুন বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।
লেজার প্রযুক্তির সুরক্ষা ও যৌথ উৎপাদন
প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই চুক্তির আওতায় সংযুক্ত আরব আমিরাত ইজরায়েলের কাছ থেকে অত্যন্ত উন্নতমানের ‘জে-মিউজিক’ (J-MUSIC) বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ক্রয় করছে। এই সিস্টেমটি মূলত 'Laser Technology' ব্যবহার করে আকাশে থাকা বিমানের দিকে ধেয়ে আসা ক্ষেপণাস্ত্রের সেন্সর অকার্যকর করে দিতে সক্ষম। চুক্তির অন্যতম প্রধান দিক হলো, এই প্রযুক্তি কেবল আমদানি নয়, বরং একটি 'Joint Project'-এর আওতায় আমিরাতের মাটিতেই তৈরি হবে। ইজরায়েল সরকার ইতিমধ্যে অত্যন্ত সংবেদনশীল এই সামরিক প্রযুক্তি হস্তান্তরের অনুমোদন দিয়েছে।
ইজরায়েলের প্রতিরক্ষা ইতিহাসের দ্বিতীয় বৃহত্তম এই চুক্তিটি বাস্তবায়িত হতে সময় লাগবে অন্তত আট বছর। সামরিক কৌশলবিদদের মতে, মধ্যপ্রাচ্যে ইরান বা ড্রোন হামলার মতো সম্ভাব্য হুমকি মোকাবিলায় আমিরাত নিজেদের আকাশসীমাকে একটি দুর্ভেদ্য 'Defense Layer' বা নিরাপত্তা বলয়ে ঢাকতে চাইছে।
মানবাধিকার সংস্থাগুলোর উদ্বেগ ও আন্তর্জাতিক সমালোচনা
এত বড় অংকের অস্ত্র চুক্তির খবরটি সামনে আসতেই তীব্র সমালোচনা শুরু করেছে ‘অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল’ ও ‘অক্সফ্যাম’-এর মতো আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলো। তাদের আশঙ্কা, এই উন্নত যুদ্ধাস্ত্রগুলো বেসামরিক জনগণের ক্ষতি করতে কিংবা আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘনে ব্যবহৃত হতে পারে। বিশেষ করে সুদানসহ বিভিন্ন অঞ্চলের গৃহযুদ্ধে আমিরাতের বিরুদ্ধে যে মিলিশিয়াদের সহায়তার অভিযোগ রয়েছে, সেখানে এই অস্ত্রশস্ত্রের অপব্যবহার হতে পারে বলে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে।
ওয়াশিংটনের কড়াকড়ি বনাম তেল আবিবের কৌশল
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, যুক্তরাষ্ট্র যেখানে প্রযুক্তিগত নিরাপত্তার (Technology Security) অজুহাতে আমিরাতকে অত্যাধুনিক এফ-৩৫ (F-35) যুদ্ধবিমান দিতে গড়িমসি করছে, সেখানে ইজরায়েল অনেক বেশি আগ্রাসীভাবে তাদের সামরিক বাজার সম্প্রসারণ করছে। ২০২০ সালের ‘আব্রাহাম অ্যাকর্ডস’ (Abraham Accords) বা সম্পর্ক স্বাভাবিকীকরণ চুক্তির পর থেকেই আবুধাবিতে ইসরাইলি প্রতিরক্ষা সংস্থাগুলো তাদের কার্যক্রম বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। 'Elbit Systems' এবং 'Israel Aerospace Industries'-এর মতো টেক জায়ান্টরা ইতিমধ্যে সেখানে তাদের প্রতিনিধি অফিস খুলেছে।
গাজা পরিস্থিতি ও বসতি স্থাপনের উত্তেজনা
এই অস্ত্র চুক্তির খবরের মাঝেই গাজা উপত্যকায় উত্তেজনা বিন্দুমাত্র কমেনি। যুদ্ধবিরতির আলোচনার মধ্যেই শুক্রবার (১৯ ডিসেম্বর) গাজা সিটিতে ইজরায়েলি হামলায় শিশুসহ অন্তত ছয় ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। এই সংঘাত নিরসনে মার্কিন বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ কাতার, মিশর ও তুরস্কের কর্মকর্তাদের সাথে রুদ্ধদ্বার বৈঠক করছেন।
অন্যদিকে, পূর্ব জেরুজালেমে কয়েক হাজার নতুন ইহুদি বসতি স্থাপনের ইজরায়েলি সিদ্ধান্তের তীব্র নিন্দা জানিয়েছে হামাস। সংগঠনটির মতে, এটি জেরুজালেমের জনতাত্ত্বিক রূপ পরিবর্তনের এক সুপরিকল্পিত নীল নকশা এবং 'International Law'-এর সুস্পষ্ট লঙ্ঘন।
গাজার ধ্বংসস্তূপের ওপর দাঁড়িয়ে একদিকে যখন রক্তক্ষয়ী সংঘাত চলছে, তখন পর্দার আড়ালে ইজরায়েল ও আমিরাতের এই ‘বিলিয়ন ডলার’ অস্ত্র বাণিজ্য মধ্যপ্রাচ্যের ক্ষমতার সমীকরণকে কোন দিকে নিয়ে যায়, এখন সেটাই দেখার বিষয়।