• ব্যবসায়
  • কেন কমছে না স্বর্ণের দাম

কেন কমছে না স্বর্ণের দাম

ব্যবসায় ১ মিনিট পড়া
কেন কমছে না স্বর্ণের দাম

বাংলাদেশের স্বর্ণের বাজারে গত এক বছর ছিল অস্থিরতা, রেকর্ড আর চমকের বছর। ২০২৪ সালের ডিসেম্বরের শেষ দিকে যেখানে সবচেয়ে ভালো মানের ২২ ক্যারেট স্বর্ণের দাম ছিল প্রতি ভরি এক লাখ ৩৮ হাজার টাকার একটু বেশি, সেখানে ২০২৫ সালের ডিসেম্বরের মাঝামাঝি এসে একই স্বর্ণের দাম ছাড়িয়ে গেছে দুই লাখ ১৭ হাজার টাকা। অর্থাৎ এক বছরে দাম বেড়েছে প্রায় ৫৮-৬০ শতাংশ পর্যন্ত।

মাত্র এক বছরের ব্যবধানে ভরি প্রতি দাম বেড়েছে প্রায় ৮০ হাজার টাকা— যা দেশের স্বর্ণের বাজারে আগে কখনও দেখা যায়নি। এই দাম এক লাফে বাড়েনি। ধাপে ধাপে, মাসের পর মাস ধরে দাম বেড়েছে। কখনও বেড়েছে দ্রুত, কখনও ধীরগতিতে, আবার মাঝেমধ্যে সামান্য কমেছেও। কিন্তু সামগ্রিক প্রবণতা ছিল ঊর্ধ্বমুখী। পরিসংখ্যান বলছে, ২০২৪ সালে স্বর্ণের দাম ৬২ বার অদলবদল হয়েছিল, এর মধ্যে ৩৫ বার বেড়েছে এবং ২৭ বার কমানো হয়েছে।

২০২৫ সালে (১৮ ডিসেম্বর পর্যন্ত) স্বর্ণের দাম ৭৫ বার পরিবর্তন হয়েছে, এর মধ্যে ৫২ বার বৃদ্ধি এবং ২৩ বার কমানো হয়। আন্তর্জাতিক বাজারে বর্তমানে প্রতি আউন্স সোনার দাম ৪ হাজার ৩২০ ডলার ছাড়িয়েছে, যা ইতিহাসের অন্যতম উচ্চ পর্যায় বলে উল্লেখ করেছেন সংশ্লিষ্টরা।

এ প্রসঙ্গে জুয়েলার্স সমিতির কোষাধ্যক্ষ অমিত ঘোষ বলেন, ‘‘২০২৫ সালে স্বর্ণের দাম প্রায় ৬০ শতাংশ বেড়েছে, তবে দাম বাড়লেও স্বর্ণের গহনার ব্যবসায় প্রত্যাশিত প্রবৃদ্ধি আসেনি। আগের তুলনায় গহনা কেনায় ক্রেতার সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়েনি।’’ তিনি জানান, উচ্চমূল্যের কারণে অনেক ক্রেতাই এখন অলংকার কেনা থেকে বিরত থাকছেন। তবে আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে স্বর্ণের দাম বাড়ায় অলংকার হিসেবে নয়, বিনিয়োগের মাধ্যম হিসেবে স্বর্ণের প্রতি মানুষের আগ্রহ বেড়েছে। বিশেষ করে অনিশ্চিত অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে নিরাপদ বিনিয়োগ হিসেবে স্বর্ণের চাহিদা বাড়ছে বলে তিনি মন্তব্য করেন।

শুরুটা ছিল তুলনামূলক শান্ত ২০২৪ সালের ডিসেম্বরের শেষে বাজুস ঘোষণা দিয়েছিল, ২২ ক্যারেট স্বর্ণের ভরি-প্রতি দাম হবে এক লাখ ৩৮ হাজার ২৮৮ টাকা। তখন আন্তর্জাতিক বাজারে স্বর্ণের দাম ছিল তুলনামূলকভাবে নিয়ন্ত্রিত। ডলারের বাজারে চাপ থাকলেও সেটি তখনও স্বর্ণের দামে বড় ধাক্কা দেয়নি।

২০২৫ সালের জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারিতে স্বর্ণের দাম বাড়তে শুরু করে ধীরগতিতে। নতুন বছরের শুরুতে বৈশ্বিক বাজারে সুদহার নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়। যুক্তরাষ্ট্রসহ বড় অর্থনীতিগুলোতে বিনিয়োগকারীরা ঝুঁকিপূর্ণ খাত থেকে সরে এসে স্বর্ণের দিকে ঝুঁকতে শুরু করেন। এর প্রভাব পড়ে দেশের বাজারেও। এই সময়ে কয়েক দফা ছোট পরিসরে দাম সমন্বয় করে বাজুস।

২০ অক্টোবর ছিল স্বর্ণের রেকর্ড দাম দেশের স্বর্ণের বাজারে ২০২৫ সালে এক নজিরবিহীন উল্লম্ফন দেখা গেছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ২০ অক্টোবর দেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ ২২ ক্যারেট স্বর্ণের দাম রেকর্ড সৃষ্টি করে, যা আগের সব দামকে ছাড়িয়ে যায়। ওইদিন ভালো মানের স্বর্ণের দাম নির্ধারণ করা হয় ২ লাখ ১৭ হাজার ৩৮২ টাকা । বিশ্লেষকরা বলছেন, স্বর্ণের এই রেকর্ড দাম কেবল অলংকার বা গহনার খাতে প্রভাব ফেলেনি, বরং বিনিয়োগের দিক থেকেও স্বর্ণের প্রতি মানুষের আগ্রহ বেড়েছে। বিশেষ করে অনিশ্চিত অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে নিরাপদ বিনিয়োগ হিসেবে স্বর্ণের চাহিদা আরও জোরালো হয়েছে।

দামের এই ঊর্ধ্বগতি শুধু সাম্প্রতিক নয়। দুই দশকের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২০০০ সালে প্রতি ভরি ২২ ক্যারেট স্বর্ণের দাম ছিল মাত্র ৬,৯০০ টাকা। এক দশক পর, ২০১০ সালে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৪২,১৬৫ টাকা। ২০২০ সালে দাম ছুঁয়েছিল প্রায় ৭০ হাজার টাকার ঘর, আর ২০২৩ সালে প্রথমবারের মতো স্বর্ণের দাম এক লাখ টাকা অতিক্রম করে। এখন দামের ঘর পেরিয়েছে প্রায় সোয়া দুই লাখের কাছাকাছি— যা দেশের স্বর্ণবাজারে এক ঐতিহাসিক রেকর্ড।

বসন্তে বাড়ে গতি মার্চ ও এপ্রিল মাসে এসে স্বর্ণের দামে বাড়তির গতি স্পষ্ট হয়। আন্তর্জাতিক বাজারে তখন স্বর্ণকে নিরাপদ বিনিয়োগ হিসেবে দেখার প্রবণতা আরও জোরালো হয়। মধ্যপ্রাচ্য ও ইউরোপে ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা, বৈশ্বিক অর্থনীতির অনিশ্চয়তা— সব মিলিয়ে স্বর্ণের প্রতি চাহিদা বাড়ে। এই সময় দেশের বাজারে একাধিকবার দাম বাড়ানো হয়। বাজুস প্রতিবারই জানায়, স্থানীয় বাজারে তেজাবি বা পিওর গোল্ডের দাম বেড়ে যাওয়ায় আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে সমন্বয় করতে হচ্ছে।

গ্রীষ্মে সামান্য বিরতি, তবে কমেনি দাম মে ও জুন মাসে স্বর্ণের দাম বাড়ার গতি কিছুটা কমে আসলেও দাম কমেনি। বাজার তখন উচ্চ অবস্থানে স্থিতিশীল থাকে। বিয়ের মৌসুম ও উৎসবকেন্দ্রিক চাহিদা থাকায় ব্যবসায়ীরা বলছেন— দাম বেশি হলেও স্বর্ণের প্রতি আগ্রহ পুরোপুরি কমে যায়নি। জুনের দিকে আবারও আন্তর্জাতিক বাজারে স্বর্ণের দাম নতুন উচ্চতায় পৌঁছায়। তার প্রভাব দ্রুত পড়ে দেশের বাজারে। এই সময়ে বাজুস তুলনামূলক বড় পরিসরে দাম বাড়ায়।

আগস্ট থেকে নভেম্বর: বড় লাফের সময় পুরো বছরের মধ্যে সবচেয়ে বড় মূল্যবৃদ্ধি দেখা যায় আগস্ট থেকে নভেম্বর পর্যন্ত সময়ে। এই কয়েক মাসে ডলার সংকট, আমদানি ব্যয় বৃদ্ধি এবং আন্তর্জাতিক বাজারে স্বর্ণের রেকর্ড দাম— সবকিছু একসঙ্গে কাজ করে। আগস্টে স্বর্ণের দাম এক দফায় বড় অঙ্কে বাড়ে। সেপ্টেম্বর ও অক্টোবরেও সেই ধারা অব্যাহত থাকে। কখনও দাম সামান্য কমানো হলেও খুব দ্রুত আবারও বাড়ানো হয়। এই সময়েই স্বর্ণের দাম এক লাখ ৭০ হাজার, পরে এক লাখ ৮০ হাজার এবং ধীরে ধীরে দুই লাখ টাকার ঘরে প্রবেশ করে।

বিশ্লেষকদের মতে, এই সময় আন্তর্জাতিক বাজারে কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর স্বর্ণ কেনা বাড়ানো, বৈশ্বিক মুদ্রাবাজারের অস্থিরতা এবং ডলারের শক্ত অবস্থান স্বর্ণের দামকে আরও চাপে ফেলে।

বছরের শেষে রেকর্ডে পৌঁছানো চলতি মাসের (ডিসেম্বর) মাঝামাঝি এসে স্বর্ণের দাম দেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছায়। বাজুস ঘোষণা দেয়, সবচেয়ে ভালো মানের ২২ ক্যারেট স্বর্ণের দাম ভরি প্রতি দুই লাখ ১৭ হাজার টাকা ছাড়িয়েছে। নতুন এই দাম ১৬ ডিসেম্বর থেকে সারা দেশে কার্যকর হয়। এক বছরে প্রায় ৮০ হাজার টাকার এই মূল্যবৃদ্ধি শুধু অলংকারের বাজার নয়, সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার ওপরও বড় প্রভাব ফেলেছে। বিয়েসহ সামাজিক অনুষ্ঠানে স্বর্ণ কেনা অনেকের জন্য কঠিন হয়ে পড়েছে।

বাজুসের সাবেক স্থায়ী কমিটির চেয়ারম্যান মাসুদুর রহমান জানান, বর্তমান প্রবণতা অব্যাহত থাকলে স্বর্ণের দাম আরও বাড়তে পারে। তার মতে, “স্বর্ণের ভবিষ্যৎ মূল্য নির্ভর করছে আন্তর্জাতিক বাজারের চাহিদা এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর স্বর্ণ সংরক্ষণের নীতির ওপর। চাহিদা বাড়লে দেশে দাম বাড়ার ধারা অস্বাভাবিক নয়।” তবে এই ঊর্ধ্বগতি সাধারণ ক্রেতাদের জন্য উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। মাসুদুর রহমান বলেন, “সোনার দাম এখন অনেকের নাগালের বাইরে। বিক্রি কমায় অনেক কারিগর বেকার হয়ে পড়ছেন।” আন্তর্জাতিক বাজারে স্বর্ণের ঊর্ধ্বগতি কেবল বাংলাদেশে নয়, দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য দেশ— ভারত, পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কা, নেপাল, ভুটান ও মালদ্বীপেও নতুন রেকর্ড তৈরি হয়েছে।

কেন থামছে না স্বর্ণের দাম বাজুস ও বাজার বিশ্লেষকদের বক্তব্যে কয়েকটি কারণ বারবার উঠে আসে— প্রথমত, আন্তর্জাতিক বাজারে স্বর্ণের দাম। বিশ্বজুড়ে অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা বাড়লে স্বর্ণের চাহিদা বাড়ে, দামও বাড়ে। দ্বিতীয়ত, ডলার সংকট ও আমদানি ব্যয়। বাংলাদেশ যেহেতু স্বর্ণ আমদানিনির্ভর, তাই ডলার দামের ওঠানামা সরাসরি স্বর্ণের দামে প্রভাব ফেলে। তৃতীয়ত, স্থানীয় বাজারে তেজাবি সোনার দাম বৃদ্ধি, যা বাজুসকে বারবার মূল্য সমন্বয়ে বাধ্য করেছে।

বিশ্লেষকরা বলছেন, এক বছরের ব্যবধানে স্বর্ণের এই উল্লম্ফন কেবল একটি পণ্যের দাম বাড়ার গল্প নয়। এটি বৈশ্বিক অর্থনীতি, মুদ্রাবাজারের চাপ এবং বিনিয়োগ প্রবণতার একটি প্রতিচ্ছবি। পরিস্থিতির বড় কোনও পরিবর্তন না এলে স্বল্পমেয়াদে স্বর্ণের দামে বড় ধরনের পতনের আশা করছেন না বাজার-সংশ্লিষ্টরা।

কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সিনিয়র সহ-সভাপতি এস এম নাজের হোসাইন মনে করেন, দেশের স্বর্ণ বাজার এখন মূলত বড় করপোরেট গোষ্ঠীর নিয়ন্ত্রণে চলে গেছে। এই প্রভাবশালী ব্যবসায়ীরা দাম বৃদ্ধি ও বাজার নিয়ন্ত্রণ করায় সাধারণ ক্রেতারা চরম ভোগান্তির মুখে পড়েছেন।

Tags: কেন কমছে না স্বর্ণের দাম